রাখিবন্ধনের আগেই সব শেষ! গাজিয়াবাদে জন্মদিনের আনন্দ নিমেষেই রক্তে ভাসাল দুই কুপুত্র!

পবিত্র রাখিবন্ধন উৎসবের ঠিক প্রাক্কালে ভাই-বোনের অটুট পবিত্র বন্ধনকে চিরতরে কলঙ্কিত করে এক লোমহর্ষক ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী থাকল উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদ। জন্মদিনের খুশির উৎসব নিমেষেই পরিণত হলো এক মহাশোকে। মদের নেশায় চুর হয়ে দুই নিজের সন্তানই হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে এবং গলা টিপে খুন করল তাদের বৃদ্ধ বাবা-মাকে। এই বর্বরোচিত ও রোমহর্ষক ঘটনাটি ঘটেছে গাজিয়াবাদের ক্রসিং রিপাবলিক থানার অন্তর্গত ভীম নগর এলাকায়। পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান অনুযায়ী, গত ২০শে জুলাই গভীর রাতে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়। এক নিমেষে দুই সন্তানের এমন চরম অমানুষিকতায় গোটা এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ঘটনার খবর পেয়ে মৃত দম্পতির দুই মেয়ে দীপিকা ও জ্যোতি ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন এবং তাদের আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশের বাতাস।

নিহত দম্পতির পরিবার সূত্রে জানা গেছে, মৃত গঙ্গাশরণ মূলত বুলন্দশহরের মূল নিবাসী হলেও দীর্ঘ বছর ধরে সপরিবারে গাজিয়াবাদে বসবাস করছিলেন। তাঁদের পরিবারে দুই ছেলে দীপক ও ললিত এবং দুই মেয়ে দীপিকা ও জ্যোতি রয়েছে। করোনা মহামারীর লকডাউনের সময় দুই ছেলেরই জাঁকজমকপূর্ণভাবে বিয়ে হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীকালে তাদের উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাত্রার কারণে স্ত্রীয়েরা তাদের ছেড়ে পিত্রালয়ে চলে যান এবং আর ফিরে আসেননি। গঙ্গাশরণের বাবা অতীতে একজন সংবাদপত্র পরিবেশক ছিলেন। ওই বাড়িটির নিচতলায় পুরো পরিবারটি বসবাস করত এবং ওপরের তলায় এক ভাড়াটিয়া থাকতেন। মূলত ওপরের ওই ভাড়টিিয়াই ঘটনার রাতে অস্বাভাবিক আওয়াজ পেয়ে পুলিশকে খবর দেন। জানা গিয়েছে, ঘটনার দিনটি ছিল অভিযুক্ত ললিতের ছোট ছেলের জন্মদিন। নাতির জন্মদিনের দীর্ঘায়ু কামনা করে ঠাকুরমা বিমলেশ পাড়ার মহিলাদের নিয়ে একটি বিশেষ কীর্তনের আয়োজন করেছিলেন এবং বাড়িতে সান্ধ্যভোজে ক্ষীর ও পুরি রান্না করা হয়েছিল। সন্ধ্যা পর্যন্ত গোটা বাড়িতে এক আনন্দমুখর ও উৎসবের পরিবেশ বজায় ছিল। কিন্তু রাত নামতেই সেই আনন্দ এক রক্তক্ষয়ী ট্র্যাজেডিতে রূপ নেয়।

পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় সূত্রে প্রকাশ, অভিযুক্ত দুই ভাই প্রচণ্ড মাত্রায় মদ্যপ ছিল এবং প্রায়ই নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ঘরে ফিরে বাবা-মায়ের সঙ্গে চরম অশান্তি ও মারধর করত। গত ২০শে জুলাই রাতেও তারা মাত্রাতিরিক্ত মদ্যপান করে বাড়িতে তাণ্ডব শুরু করে। বাবা গঙ্গাশরণ এবং মা বিমলেশ তাদের এই অপকর্মের তীব্র প্রতিবাদ করলে দুই ভাইয়ের সঙ্গে তাদের তুমুল তর্কবিতর্ক শুরু হয়। অভিযোগ উঠেছে, সেই ঝগড়া মুহূর্তের মধ্যে চরম হিংসাত্মক রূপ নেয় এবং দুই কুপুত্র প্রথমে তাদের বৃদ্ধ বাবা গঙ্গাশরণকে এলোপাথাড়ি আক্রমণ করে। চোখের সামনে স্বামীকে রক্তাক্ত হতে দেখে মা বিমলেশ তাদের বাঁচাতে এগিয়ে এলে পাষণ্ড দুই ছেলে তাঁকেও ছাড়েনি। তারা দুজনেই বাবা-মায়ের গলা টিপে ধরে এবং এরপর ঘরে থাকা ভারী হাতুড়ি দিয়ে উপর্যুপরি মাথায় আঘাত করে নৃশংসভাবে খুন করে। গুরুতর জখম অবস্থায় ওই দম্পতিকে দ্রুত স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও চিকিৎসকরা তাঁদের মৃত বলে ঘোষণা করেন।

মৃত দম্পতির বড় মেয়ে দীপিকা গণমাধ্যমের সামনে তাঁর দুই ভাইয়ের এই ভয়াবহ অপকর্ম ও অপরাধের ইতিহাস তুলে ধরেছেন। তিনি কাঁদতে কাঁদতে অভিযোগ করেন যে, অভিযুক্ত দুই ভাই দীর্ঘদিন ধরে মারাত্মক মদে আসক্ত ছিল এবং প্রায়শই টাকার জন্য বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ওপর শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার চালাত। এমনকী মদের নেশার খরচ জোগাড় করতে তারা তাদের মায়ের সর্বস্ব সোনার গয়না পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়েছিল। এত কিছুর পরেও স্নেহাসক্ত বাবা-মা সবসময় তাদের অপরাধ ক্ষমা করে দিতেন এবং এই আশায় বুক বাঁধতেন যে একদিন তাদের ছেলেরা নিশ্চয়ই শুধরে যাবে। কিন্তু সেই অন্ধ স্নেহ যে একদিন তাদের জীবন কেড়ে নেবে, তা ঘুণাক্ষরেও টের পাননি কেউ। দীপিকা ক্ষোভে ফেটে পড়ে বলেন, “এমন ভাই যেন কারও না থাকে, যারা নিজের জন্মদাতা বাবা-মায়ের জীবন কেড়ে নেয়। আমার ভাইয়েরা যেমন আমার বাবা-মাকে খুন করেছে, আইনত তাদেরও তেমনই কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত।” ঘটনার আকস্মিকতায় স্তব্ধ স্থানীয় বাসিন্দারাও। এদিকে খবর পেয়েই পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং উভয় অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ধারায় হত্যা মামলা রুজু করে তাদের গ্রেফতারে তল্লাশি শুরু করেছে।