রথের দড়ি টানলেই কি সব পাপমুক্তি? জগন্নাথ দেবের রথযাত্রার নেপথ্যে লুকিয়ে থাকা গূঢ় আধ্যাত্মিক রহস্য!

ওড়িশার পুরীতে এখন রথযাত্রার সাজ সাজ রব। লক্ষ লক্ষ মানুষের ভিড়ে মুখরিত শ্রীক্ষেত্র। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, জগন্নাথ দেবের রথের দড়িতে হাত ছোঁয়ালে বা সামান্য টান দিলেই জীবনের সমস্ত পাপ থেকে মুক্তি মেলে। কিন্তু এই দড়ি টানার মাহাত্ম্য কি কেবলই লোকবিশ্বাস? নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে গভীর জীবন দর্শন ও আধ্যাত্মিক বিজ্ঞান?
শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা অনুযায়ী, হিন্দু ধর্মে রথকে কেবল একটি কাঠের বাহন হিসেবে দেখা হয় না, বরং রথকে মানুষের শরীরের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। আমাদের পাঁচটি ইন্দ্রিয় হলো সেই রথের ঘোড়া, আর আমাদের মন হলো সেই ঘোড়াগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার দড়ি। রথযাত্রার দড়ি টানা আসলে নিজের শরীর, মন এবং অনুভূতির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সেগুলোকে স্বয়ং ঈশ্বরের চরণে সমর্পণ করার প্রতীক। অহঙ্কার ত্যাগ করে শৃঙ্খলা এবং দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি নিয়ে জীবনপথে এগিয়ে চলাই রথযাত্রার আসল শিক্ষা। বিশ্বাস করা হয়, দড়ি টানার মাধ্যমে মানুষ ঈশ্বরের সঙ্গে এক সরাসরি আত্মিক সংযোগ স্থাপন করে।
বিভিন্ন পুরাণে রথযাত্রার বিশেষ মাহাত্ম্যের কথা উল্লেখ রয়েছে। ‘ইন্দ্রনীলময় পুরাণ’ ও ‘সূতসংহিতা’ অনুযায়ী, রথে বিরাজমান বামনরূপী জগন্নাথদেবকে দর্শন করে তাঁর রশি স্পর্শ করলে বা সামান্য টান দিলে ভক্ত পুনর্জন্মের বন্ধন থেকে মুক্তি লাভ করেন। আবার ‘স্কন্দপুরাণ’ ও ‘বামদেব সংহিতা’র বর্ণনা অনুযায়ী, এই রথের দড়ি টানার পুণ্যফল বৈদিক যুগের অশ্বমেধ যজ্ঞের সমান। ‘কপিল সংহিতা’য় বলা হয়েছে, গুণ্ডিচা যাত্রার সময় জগন্নাথ দেবের দর্শন মানুষের সমস্ত পাপ মোচন করতে সক্ষম। যুগের পর যুগ ধরে এই অমোঘ বিশ্বাসই ভক্তদের পুরীর দিকে টেনে আনে।
রথযাত্রার মূল আকর্ষণে থাকে তিনটি বিশালকায় রথ। প্রথা অনুযায়ী, সবার আগে যাত্রা শুরু হয় বড় ভাই বলভদ্র বা বলরামের রথ ‘তালধ্বজ’-এর। ৪৪ ফুট উচ্চতার এই রথটি মোট ৭৬৩টি কাঠের টুকরো দিয়ে অত্যন্ত নিপুণভাবে তৈরি করা হয়। এরপর থাকে দেবী সুভদ্রার রথ ‘দর্পদলন’, যার উচ্চতা ৪৩ ফুট। পতাকায় পদ্ম চিহ্ন থাকার কারণে অনেকে একে ‘পদ্মধ্বজ’ নামেও ডেকে থাকেন। সবার শেষে আসে স্বয়ং মহাপ্রভু জগন্নাথের রথ—’নন্দীঘোষ’। ৪৫ ফুট উচ্চতার এই রথটিই ভক্তদের কাছে পরম আরাধ্য। রথের এই সুবিশাল গঠন এবং তাদের প্রতিটি খুঁটিনাটি যেন মহাজাগতিক এক নিয়মের প্রতিফলন। তাই এবারের রথযাত্রায় যখনই আপনি দড়িতে হাত দেবেন, মনে রাখবেন, এটি কেবল একটি দড়ি নয়, এটি আপনার জীবনের সুতো যা স্বয়ং ঈশ্বরের হাতের ছোঁয়া পেতে ব্যাকুল।