যমুনার জলে বিষ ছড়াত ক্রুর কালিয়া নাগ! কীভাবে ছোট্ট কৃষ্ণের চরণে দর্প চূর্ণ হয়েছিল তার?

হিন্দু ধর্মে পবিত্র শ্রাবণ বা সাওয়ান মাস দেবাদিদেব মহাদেব ভোলেবনাথের ভক্তি আরাধনার পাশাপাশি বহু প্রাচীন পৌরাণিক উৎসব ও আধ্যাত্মিক পর্বের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। এই পবিত্র মাসেই অত্যন্ত আড়ম্বরের সঙ্গে উদযাপিত হয় মহাশক্তিধর নাগ পঞ্চমী উৎসব। এই বিশেষ দিনে ভক্তরা সাপের দেবতা বা নাগ দেবতার পুজো করে থাকেন। নাগ পঞ্চমীর নাম উচ্চারণ করলেই সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মনে ভেসে ওঠে মহাদেবের গলায় শোভা পাওয়া বাসুকি নাগ এবং শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে কালিয়া নাগের ঐতিহাসিক বধ ও বিজয়ের রোমহর্ষক কাহিনি। বিশেষ করে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও কালিয়া নাগের এই পৌরাণিক উপাখ্যান নাগ পূজার শাশ্বত ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
বৈদিক পঞ্জিকা অনুসারে, প্রতি বছর শ্রাবণ মাসের শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথিতে এই উৎসব পালিত হয়। ২০২৬ সালে এই পবিত্র পঞ্চমী তিথি শুরু হবে আগামী ১৬ আগস্ট বিকেল ৪টা বেজে ৫২ মিনিটে এবং তা সমাপ্ত হবে ১৭ আগস্ট বিকেল ৫টা নাগাদ। সনাতন ধর্মে উদয়া তিথির মাহাত্ম্য অনুসারে, আগামী ১৭ আগস্ট ২০২৬, সোমবার অত্যন্ত শুভ যোগে নাগ পঞ্চমী উদযাপিত হবে। পৌরাণিক কিংবদন্তি অনুসারে, কালিয়া নামক এক বিশাল, অত্যন্ত হিংস্র ও বিষধর সাপ একসময় যমুনা নদীর গভীর জলে বাসা বেঁধেছিল। তার বিষের তীব্রতা এতই ভয়াবহ ছিল যে সম্পূর্ণ যমুনার জল বিষাক্ত হয়ে পড়েছিল এবং নদীর আশেপাশের পরিবেশও মারাত্মকভাবে দূষিত হয়ে উঠেছিল। কালিয়া নাগের ত্রাসের কারণে যমুনাপারের সাধারণ মানুষ এবং পশুপাখিরা চরম বিপদের সম্মুখীন হয়েছিল। ভয়ে কেউ ওই এলাকার ত্রিসীমানায় যেতে সাহস পেত না। গোকুল ও বৃন্দাবনের বাসিন্দাদের কাছে এই কালিয়া নাগ এক আতঙ্কের অন্য নাম হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
একদিন বাল্যকালে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর সখা ও বন্ধুদের সঙ্গে যমুনার তীরে খেলা করছিলেন। খেলাচ্ছলে হঠাৎই তাঁদের ফুটবল বা বলটি সোজা যমুনা নদীতে গিয়ে পড়ে। বলটি উদ্ধার করার জন্য ছোট্ট কৃষ্ণ বিনা দ্বিধায় উত্তাল নদীতে ঝাঁপ দেন। নদীর গভীরে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর মুখোমুখি হয় ভয়ংকর কালিয়া নাগ। ক্রুদ্ধ নাগ নিজের বিষাক্ত ফণা ও বিশাল শরীর দিয়ে কৃষ্ণকে পেঁচিয়ে ফেলার চেষ্টা করে। কিন্তু পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ অত্যন্ত সহজে সেই বন্ধন ছিন্ন করে মুক্ত হন। এরপর কৃষ্ণ ও কালিয়া নাগের মধ্যে তুমুল লড়াই শুরু হয়। পৌরাণিক উপাখ্যান অনুযায়ী, একপর্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ ক্ষিপ্রতার সঙ্গে কালিয়া নাগের একাধিক ফণার ওপর উঠে পড়েন এবং তাঁর ওপর মহাছন্দে নৃত্য শুরু করেন। কৃষ্ণের শ্রীপাদের প্রচণ্ড আঘাতে কালিয়া নাগ ধীরে ধীরে শক্তিহীন ও পর্যুদস্ত হয়ে পড়ে।
যখন কালিয়া নাগ কৃষ্ণের অলৌকিক শক্তির সামনে সম্পূর্ণ পরাজিত ও মৃত্যুর মুখোমুখি, তখন তার স্ত্রী অর্থাৎ নাগপত্নীরা ব্যাকুল হয়ে শ্রীকৃষ্ণের চরণে এসে উপস্থিত হন। তাঁরা কৃষ্ণের কাছে প্রাণভিক্ষা চান এবং কালিয়া নাগের সমস্ত অপরাধ ও অহংকারের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। দয়াময় শ্রীকৃষ্ণ তাঁদের সেই কাতর প্রার্থনা মঞ্জুর করেন এবং কালিয়া নাগকে জীবনদান করেন। তবে তিনি কালিয়া নাগকে অবিলম্বে যমুনা নদী চিরতরে ত্যাগ করে গভীর সমুদ্রে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। একইসঙ্গে শ্রীকৃষ্ণ তাকে আশ্বস্ত করেন যে তাঁর শ্রীচরণের পবিত্র চিহ্ন তার শরীরে অঙ্কিত থাকায় মহা পরাক্রমশালী গরুড়ও আর তার কোনো অনিষ্ট করতে পারবে না।
লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, নাগ পঞ্চমীর মূল তাৎপর্য নিহিত রয়েছে শ্রীকৃষ্ণের হাতে কালিয়া নাগের অহংকার চূর্ণ হওয়া এবং তাকে পরাস্ত করার এই ঐতিহাসিক ঘটনার মধ্যে। সাপের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং তাদের সংরক্ষণের বার্তা দিতেই এই ব্রত পালিত হয়। নাগ পঞ্চমীর পবিত্র দিনে নাগ দেবতার পুজো করার এই প্রাচীন প্রথা আজও সমানভাবে প্রচলিত। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে, এই দিনে নিষ্ঠাভর্মে নাগ দেবতার আরাধনা করলে পরিবারে অখণ্ড সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি বজায় থাকে। দেশের বহু অঞ্চলে এই দিনে নাগ দেবতার প্রতিকৃতিতে দুধ ও সুস্বাদু ভোগ অর্পণ করার বিশেষ রীতি রয়েছে। ২০২৬ সালের ১৭ আগস্ট সোমবার নাগ পঞ্চমী পড়ার কারণে এর মাহাত্ম্য বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ভক্তদের আধ্যাত্মিক সাধনাকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেবে।