মাত্র এক ঘণ্টায় জোড়া কম্পন! মুম্বাইয়ের কাছে মাটির নিচে কী ঘটছে? জানলে শিউরে উঠবেন!

সোমবার রাতে মহারাষ্ট্রের উপকূলীয় জেলা পালঘরে মাত্র এক ঘণ্টার ব্যবধানে ৩.৪ মাত্রার দুটি পরপর ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়েছে। প্রথম কম্পনটি রাত ১০টা বেজে ৪ মিনিটে এবং দ্বিতীয়টি ঠিক রাত ১১টায় অনুভূত হয়। দুটি কম্পনের তীব্রতাই প্রায় সমান ছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন বা সাধারণ ঘটনা নয়। গত ২১শে জুলাই থেকে এই নির্দিষ্ট এলাকায় ঘন ঘন মোট ছয়টি কম্পন অনুভূত হয়েছে, যার মধ্যে শুধু গত মাসেই তিনটি জোরালো কম্পন রেকর্ড করা হয়েছিল। পালঘরের এই অদ্ভুত ভূকম্পন প্রবণতা গত কয়েক সপ্তাহ বা মাসের ব্যাপার নয়, বরং এটি সুদূর ২০১৮ সালের নভেম্বর মাস থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে চলে আসছে, যেখানকার মাটির নিচে হাজার হাজার ছোট ও কম তীব্রতার মাইক্রো-ভূমিকম্প নিয়মিত অনুভূত হচ্ছে। বিশেষ করে বাণিজ্যনগরী মুম্বাই থেকে মাত্র ১০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই উপকূলীয় অঞ্চলে মাটির নিচে ঠিক কী এমন হচ্ছে, তা জানতে এখন ভূতত্ত্ববিদদের সাম্প্রতিক গবেষণা এবং বৈজ্ঞানিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এই ৫টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর জেনে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
প্রথমত, পালঘরে এ পর্যন্ত ঠিক কতবার কম্পন অনুভূত হয়েছে? একটি প্রামাণ্য বৈজ্ঞানিক গবেষণা অনুসারে, ২০১৮ সালের নভেম্বর মাস থেকে পালঘর জেলা ও তার পার্শ্ববর্তী সংলগ্ন এলাকায় হাজার হাজার ছোট-বড় কম্পন অনুভূত হয়েছে। এই কম্পনগুলোর বেশিরভাগেরই তীব্রতা রিখটার স্কেলে ১.৫ থেকে ৩.৮-এর মধ্যে ঘোরাফেরা করেছে। আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাত জার্নাল ‘সায়েন্সডাইরেক্ট’-এ প্রকাশিত এই গবেষণা অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের মে মাসের দীর্ঘ সময়সীমার মধ্যে পালঘরে ১০,০০০-এরও বেশি ছোট ছোট ভূমিকম্প বা মাইক্রো-কোয়েক রেকর্ড করা হয়েছে, যা রীতিমতো উদ্বেগের বিষয়।
দ্বিতীয়ত, ভৌগোলিকভাবে পালঘর কোন পাতের উপর অবস্থিত? ভূতাত্ত্বিক গঠন অনুযায়ী, পালঘর অত্যন্ত সংবেদনশীল ভারতীয় পাতের ঠিক ওপরের অংশে অবস্থিত। এই বিশাল ভারতীয় পাতটি ক্রমাগত উত্তর-পূর্ব দিকে সরে চলেছে এবং এশীয় পাতের সাথে তীব্র সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। প্রশাসনিক ও ভৌগোলিক বিচারে পালঘর জেলা ভারতের তৃতীয় ভূকম্পন অঞ্চল বা সিসমিক জোন থ্রি-এর মধ্যে পড়ে, যা বিজ্ঞানীদের মতে একটি মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত। এই নির্দিষ্ট অঞ্চলের ভূগর্ভের নিচে ভারতীয় উপদ্বীপীয় শিল্ডের পশ্চিম উপকূল এবং দাক্ষিণাত্য ট্র্যাপের প্রাচীন ব্যাসল্টিক শিলাস্তর অত্যন্ত সক্রিয় অবস্থায় রয়েছে।
তৃতীয়ত, এই অঞ্চলে এত ঘন ঘন ধাক্কা লাগার আসল বৈজ্ঞানিক কারণ কী? পালঘরে বারবার ভূমিকম্প হওয়ার পেছনে প্রধানত দুটি জোরালো বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, একে বলা হয় ‘ভূমিকম্পের ঝাঁক’ বা আর্থকোয়াক সোয়ার্ম। যখন কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে বড় ধরনের কোনো প্রধান ভূমিকম্প ছাড়াই একই স্থানে ধারাবাহিকভাবে ছোট ছোট কম্পন বা ঝাঁকুনি অনুভূত হয়, তখন তাকে এই বিশেষ নামে অভিহিত করা হয়। পালঘর ২০১৮ সালের নভেম্বর মাস থেকে অবিরত এটি অনুভব করে আসছে। দ্বিতীয় কারণটি হলো জল-ভূমিকম্প বা বর্ষার প্রত্যক্ষ প্রভাব। বিজ্ঞানীদের জোরালো অভিমত যে, বর্ষাকালে ভারী বৃষ্টির জল ভূত্বকের উপরের আলগা স্তর ভেদ করে প্রাচীন ভূগর্ভস্থ ফাটল এবং ফল্ট লাইনে সোজা গিয়ে পৌঁছায়। এই অতিরিক্ত জল জমে যাওয়ার ফলে শিলাগুলির অভ্যন্তরীণ তরল চাপ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়, যার কারণে ডেকান ব্যাসল্ট শিলাগুলি একে অপরের উপর দিয়ে পিছলে যায় এবং তীব্র কম্পন সৃষ্টি করে। ঠিক এই কারণেই প্রতিবার বর্ষাকালে এবং বর্ষার ঠিক অব্যবহিত পরেই পালঘর এলাকায় কম্পনের মাত্রা ও আধিক্য বহুগুণ বেড়ে যায়।
চতুর্থত, এই পরিস্থিতির পর ঠিক কী ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে? গবেষক ও বিজ্ঞানীদের মতে, এই ধরনের ঝাঁক বা সোয়ার্ম কার্যকলাপের ফলে ভূগর্ভে দীর্ঘদিন ধরে সঞ্চিত বিপুল পরিমাণ শক্তি ধীরে ধীরে এই সমস্ত ছোট ছোট কম্পনের মাধ্যমেই বাইরে নির্গত হয়। তাই আগামী ভবিষ্যতেও কম তীব্রতার এই ধরনের মৃদু কম্পন অব্যাহত থাকার পূর্ণ সম্ভাবনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক জার্নাল সায়েন্সডাইরেক্টে প্রকাশিত গবেষণাটিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, পালঘরে চলমান এই অবিরাম ভূমিকম্পীয় কার্যকলাপের কারণে এই সমগ্র অঞ্চলের ভূমিকম্প ঝুঁকির একটি একেবারে নতুন ও সঠিক মূল্যায়ন করা অত্যন্ত অপরিহার্য। গবেষণাটিতে দীর্ঘ ৫০ বছরের জন্য ১০% এবং ২% সম্ভাবনার ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ভূমি ত্বরণের একটি সম্ভাব্যতাভিত্তিক মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়েছে। এতে সতর্ক করে বলা হয়েছে যে, যদিও এই কম্পনগুলো বর্তমানে মৃদু প্রকৃতির মনে হচ্ছে, তবুও আগাম সতর্কতা অবলম্বন করা এবং স্থানীয় অবকাঠামোকে আরও শক্তিশালী করে তোলা অত্যন্ত জরুরি।
পঞ্চমত, এর ফলে ঠিক কতজন সাধারণ মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন? পালঘর জেলার বর্তমান আনুমানিক জনসংখ্যা প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লক্ষের কাছাকাছি। বিশেষ করে দাহানু, তালাসারি এবং এর পার্শ্ববর্তী প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকার বসবাসকারী বাসিন্দারা এই কম্পনগুলোর দ্বারা সবচেয়ে বেশি ও সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। জেলার এই গ্রামীণ ও আদিবাসী-অধ্যুষিত জনবহুল এলাকাগুলিতে সাধারণত মাটি, পোড়ামাটির ইট এবং খালি কড়িকাঠ বা বাঁশ দিয়ে ঐতিহ্যগতভাবে ঘরবাড়ি নির্মিত হয়। যদিও ৩.০ থেকে ৩.৫ মাত্রার মাঝারি মানের ভূমিকম্প সচরাচর খুব বড় ধরনের বড় ধ্বংসযজ্ঞ ঘটাতে পারে না, তবুও এই ক্রমাগত ও পুনরাবৃত্ত কম্পনের ফলে দরিদ্র মানুষের এই কাঁচা ঘরবাড়ির দেওয়ালগুলোতে বড় বড় ফাটল ধরে যাচ্ছে, যা যেকোনো মুহূর্তে সেগুলোকে ধসিয়ে দেওয়ার মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষ করে পালঘর মুম্বাই মেট্রোপলিটন অঞ্চল অর্থাৎ এমএমআর থেকে মাত্র ১০০ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত হওয়ায় বিষয়টি আরও বেশি ভীতিপ্রদ। ভবিষ্যতে যদি কোনো কারণে এখানকার বড় কোনো ফল্ট লাইনের কারণে উচ্চ-তীব্রতার ভয়াবহ ভূমিকম্প সংঘটিত হয়, তবে তা উপকূলীয় মহারাষ্ট্রের বিশাল এলাকা এবং বাণিজ্যনগরী মুম্বাইয়ের ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলগুলোকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও প্রভাবিত করতে পারে।
পরিশেষে, সাধারণ ঝাঁক এবং সাধারণ বা মূল ভূমিকম্পের মধ্যে মৌলিক কিছু পার্থক্য রয়েছে। সাধারণ বা প্রথাগত ভূমিকম্পে প্রথমে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী প্রধান কম্পনের পর ছোট ছোট অনুকম্পন বা আফটারশক অনুভূত হয়। কিন্তু এর সম্পূর্ণ বিপরীতে, পালঘরের বর্তমান ভূমিকম্পের ঝাঁক কোনো ধরনের বড় প্রধান কম্পন ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে মাস বা বছরব্যাপী নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে থাকে, যা শত শত ছোট ছোট মৃদু কম্পনের সমষ্টি মাত্র। এই অবস্থায় পালঘর এবং এর পার্শ্ববর্তী উপকূলীয় জেলাগুলোর স্থানীয় প্রশাসনের উচিত কালবিলম্ব না করে অবিলম্বে এখানকার সমস্ত আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনগুলোর কাঠামোগত নিরাপত্তা সংক্রান্ত নিরীক্ষা বা স্ট্রাকচারাল অডিট দ্রুত শুরু করা।