মেয়ের পালকি রওনা হতেই চিরবিদায়! হাসপাতালে ভিডিও কলে বিয়ে দেখা বাবার করুণ মৃত্যু

সীতামঢ়ীর মাটি থেকে উঠে এল এক হৃদয়বিদারক কাহিনী, যা প্রতিটি মানুষের চোখের কোণ ভিজিয়ে দেওয়ার মতো। এক বাবার অদম্য জেদ আর মেয়ের প্রতি অফুরান ভালোবাসা—এই দুইয়ের সাক্ষী থাকল বিহারের সীতামঢ়ী জেলার মোহনপুর। মেয়ের বিয়ে দেখা আর তাকে শেষবারের মতো বিদায় জানানোই ছিল বাবা লালবাবু মাহাতোর জীবনের শেষ আকাঙ্ক্ষা। প্রযুক্তির সহায়তায় সেই ইচ্ছা পূরণ হলেও, মুহূর্তের ব্যবধানেই নেমে এল চরম বিষাদ।
পেশায় বাস কন্ডাক্টর লালবাবু মাহাতো সারাজীবন পরিশ্রম করে বড় করেছেন তাঁর সন্তানদের। ছোট মেয়ে নিধি কুমারীর বিয়ের ঠিক তিন দিন আগে ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে হঠাৎ তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে লখনউয়ের একটি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। মেয়ের বিয়ের আনন্দ যখন বাড়িতে তুঙ্গে, তখন হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছিলেন বাবা।
বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে না পারলেও, আধুনিক প্রযুক্তির আশীর্বাদে তিনি হাসপাতালের বিছানা থেকেই মেয়ের বিয়ের প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করেন। পরিবারের সদস্যরা ভিডিও কলের মাধ্যমে তাঁকে হলদি, বরমাল্য ও বিয়ের মন্ত্রপাঠ শোনান। হাসপাতালের সেই একঘেয়ে চার দেওয়ালের মাঝে শুয়েই মেয়ের নতুন জীবনের স্বপ্ন পূরণ হতে দেখেন বাবা। সকালে যখন নিধির বিদায় অনুষ্ঠান শুরু হয়, তখন বাবার চোখে জল চিকচিক করে উঠছিল। স্ত্রী মিনু দেবী ও ছেলের উপস্থিতিতে হাসপাতালের কেবিন থেকেই তিনি প্রাণভরে আশীর্বাদ জানান আদরের কন্যাকে।
কিন্তু নিয়তির লিখন বোধহয় এমনই ছিল। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে যখন তিনি দেখলেন তাঁর মেয়ে নতুন জীবনে পা রাখার জন্য শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশ্যে পালকি বা গাড়িতে উঠছে, ঠিক সেই মুহূর্তেই সব সংগ্রামের ইতি টানলেন লালবাবু। মেয়ে যেমন শ্বশুরবাড়ি যাত্রা শুরু করল, বাবা তেমনই রওনা দিলেন এক অনন্ত অজানার পথে। মেয়ের পালকি তোলা আর বাবার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ—এই দুই ঘটনার মধ্যে ছিল মাত্র কয়েক মুহূর্তের ব্যবধান।
বাবার এই প্রস্থান এক নিমেষে বিয়ের আনন্দকে শোকের ছায়ায় ঢেকে দেয়। পেছনে রেখে গেলেন স্ত্রী, তিন ছেলে ও দুই মেয়েকে। স্থানীয় মানুষজন বলছেন, মেয়েকে হাসিমুখে বিদায় দেওয়ার অপেক্ষাতেই বোধহয় তিনি শেষ সম্বলটুকু বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। বাবা-মেয়ের এই নাড়ির টান এবং বিদায়ের এই করুণ কাহিনি এখন সীতামঢ়ী ছাড়িয়ে চর্চার বিষয়। লালবাবু মাহাতো হয়তো শারীরিকভাবে নেই, কিন্তু তাঁর মেয়ের নতুন জীবনের শুরুতে বাবার দেওয়া শেষ আশীর্বাদ অমর হয়ে থাকল ইতিহাসের পাতায়।