দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা একসময় পরিচিত ছিল তৃণমূল কংগ্রেসের অভেদ্য দুর্গ বা খাসতালুক হিসেবে। কিন্তু ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও পদ্মঝড়ের দাপটে এই জেলাতেও বড় ধাক্কা খেয়েছে ঘাসফুল শিবির। এই আবহে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রে আগামী ২১ মে পুনরায় ভোটগ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। আর সেই হাইভোল্টেজ পুনর্নির্বাচনকে পাখির চোখ করে রবিবার ফলতায় প্রচারে এসে একযোগে কর্মসংস্থান এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলের বড় বার্তা দিলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য।
‘পরিযায়ী শ্রমিকের জেলা’ তকমা ঝেড়ে ফেলার সময় এসেছে
দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিস্তীর্ণ এলাকার বহু মানুষ রুটি-রুজির টানে ভিনরাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে যান। সেই প্রসঙ্গ তুলে ধরে শমীক ভট্টাচার্য বলেন, “দক্ষিণ ২৪ পরগনা মানেই পরিযায়ী শ্রমিকের জেলা— এই চেনা পরিচয় এ বার ঝেড়ে ফেলার সময় এসেছে।” তিনি স্পষ্ট আশ্বাস দেন, বিজেপি সরকার এই জেলায় নতুন শিল্প নিয়ে আসার জন্য বদ্ধপরিকর। তার জন্য কেবল দেশেই নয়, বরং বিদেশে ছড়িয়ে থাকা বাঙালি শিল্পপতি, উদ্যোগপতি এবং সফল স্টার্ট-আপ তৈরি করা বাঙালি তরুণদের বাংলায় বিনিয়োগ করার আহ্বান জানানো হচ্ছে। বিদেশে কর্মরত বাঙালি ইঞ্জিনিয়াররা যাতে এ বার নিজেদের রাজ্যে ফিরে ব্যবসা করতে পারেন এবং বাংলায় শিল্পের জোয়ার ফেরে, সেই লক্ষ্যেই বিজেপি কাজ করছে বলে জানান তিনি।
‘তৃণমূল খড়কুটোর মতো উড়ে গিয়েছে, আগামী দিনে অস্তিত্বই থাকবে না’
ফলতার জনসভা থেকে তৃণমূলের ভবিষ্যৎ নিয়ে তীব্র আক্রমণ শানান বিজেপির রাজ্য সভাপতি। তিনি দাবি করেন, “এর পরের নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস নামে কোনও রাজনৈতিক দলই থাকবে না।” শমীকবাবু বলেন, “আগে যখন আমি এই কথা বলতাম, তখন সমাজবিজ্ঞান বা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তত্ত্ব নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলতেন। কিন্তু আজ কোচবিহার কিংবা আলিপুরদুয়ারে তৃণমূলের কোনও অস্তিত্ব নেই। আগে বলতাম থাকবে না, এখন বলছি সত্যিই নেই। এমনকি মুর্শিদাবাদেও তৃণমূল এখন কার্যত হামাগুড়ি দিচ্ছে।” বিজেপির পক্ষে তৈরি হওয়া জনসমর্থনের ঝড়ে শাসকদল খড়কুটোর মতো উড়ে গিয়েছে এবং ফলতার পুনর্নির্বাচনেও সেই একই ছবি দেখা যাবে বলে তিনি ১০০ শতাংশ নিশ্চিত।
তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বকে খোঁচা দিয়ে তিনি আরও বলেন, “স্থানীয় স্তরে অনেকে বলছেন ফলতার প্রচারে তৃণমূলকে দেখাই যাচ্ছে না। আমরা বলছি, আপনারা আসুন, ফলতায় প্রচার করুন। আমাদের কর্মীরা আপনাদের উলু দিয়ে, শাঁখ বাজিয়ে স্বাগত জানাবে। কিন্তু কোথায় তিনি? তিনি তো নেই!” শমীক ভট্টাচার্য স্পষ্ট করেন যে, বিজেপি কখনও ঘৃণার বা আগ্রাসনের রাজনীতি করতে চায় না, তবে অতীতের অত্যাচারও কর্মীরা ভুলে যাবেন না। বিজেপি মূলত রাজ্যের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির বদল ঘটাতে চায়।
১ লক্ষ ভোটের টার্গেট এবং ‘মা অন্নপূর্ণা যোজনা’ নিয়ে মেগা আশ্বাস
ফলতা আসন থেকে বিজেপি প্রার্থী দেবাংশু পন্ডাকে ১ লক্ষেরও বেশি ভোটে জেতানোর ডাক দেন শমীক ভট্টাচার্য। এর আগের দিনই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ফলতায় এসে দলের জয়ের লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দিয়েছিলেন। সেই সুর টেনেই শমীক বলেন, “আপনারা প্রার্থীকে ১ লক্ষ ভোটে জেতান, আর তারপর সমস্ত কাজ করিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব আপনাদের।” মাটিগাড়া-নকশালবাড়ি কেন্দ্র থেকে বিজেপি প্রার্থী আনন্দময় বর্মণের ১ লক্ষেরও বেশি ভোটে জেতার রেকর্ডকে ফলতায় ভেঙে দেওয়ার টার্গেট দেন তিনি।
এর পাশাপাশি রাজ্যের মহিলাদের জন্য ‘মা অন্নপূর্ণা যোজনা’ নিয়ে এক বিশাল ঘোষণা করেন শমীক ভট্টাচার্য। তিনি আশ্বাস দিয়ে বলেন, “আগামী ১ জুন প্রত্যেক মহিলার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে মা অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা পৌঁছে যাবে। এবং সবথেকে বড় কথা, আগে মহিলারা যা পেতেন, এবার থেকে সরাসরি তার দ্বিগুণ টাকা তাঁদের অ্যাকাউন্টে পাঠানো হবে।”
নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে আগামী ২১ মে ফলতায় নতুন করে ভোটগ্রহণ হতে চলেছে। তার আগে বিজেপি রাজ্য সভাপতির এই শিল্পায়ন এবং দ্বিগুণ ভাতার আশ্বাস ভোটের বাক্সে কতটা প্রভাব ফেলে, এখন সেটাই দেখার।





