মুক্তমনা ক্যাম্পাসে তাণ্ডব! পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে লোহার গেট চূর্ণ, যাদবপুরকাণ্ডে তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে বিগত কয়েকদিন ধরে চলা উত্তেজনা এবার এক ভয়াবহ ও রক্তাক্ত রূপ ধারণ করেছে। ফ্যাকাল্টি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি স্টুডেন্টস ইউনিয়নের (FETSU) সাধারণ সভা বা জিবি মিটিংয়ের আইনি এক্তিয়ার নিয়ে শুরু হওয়া তীব্র দ্বন্দ্বে বুধবার রাত থেকে দফায় দফায় সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন। দুই পক্ষের এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে একাধিক ছাত্র গুরুতর আহত হন। গভীর রাতেই আহতদের হাসপাতালে দেখতে ছুটে যান বিধায়ক শর্বরী মুখোপাধ্যায়। তিনি প্রকাশ্যে তীব্র প্রশ্ন তোলেন যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ছাত্রভোট না হওয়ায় আদতে কোন আইনি এক্তিয়ারে এই সাধারণ সভা ডাকা হয়েছিল।

পরিস্থিতি এতটাই লাগামছাড়া হয়ে ওঠে যে, বৃহস্পতিবার বেলা গড়ার সঙ্গে সঙ্গেই যাদবপুর চত্বর কার্যত একটি রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পুলিশের কঠোর নিরাপত্তা ও ব্যারিকেড ভেঙে এবিভিপি (ABVP)-এর সমর্থকরা মিছিল করে বিশ্ববিদ্যালয়ের চার নম্বর গেট পর্যন্ত পৌঁছে যান। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সমস্ত গেট বন্ধ করে দিলেও বিক্ষোভকারীরা বাইরে থেকে ইট, পাথর, ডিম ও জলের বোতল ছুড়তে শুরু করেন। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী লোগো বা এমব্লেমের ওপর চড়ে গেট টপকানোর চেষ্টার সময় মূল প্রতীকের একটি অংশ ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। এই ন্যাক্কারজনক ভাঙচুরে সাধারণ শিক্ষক ও পড়ুয়াদের মনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

এই সংঘাতের জেরে দুই শিবির থেকেই এসেছে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক অভিযোগ। আরএসএস-এর ছাত্র সংগঠন এবিভিপির দাবি, সাধারণ সভার নামে ডেকে এসএফআই (SFI) এবং ডিএসএফ (DSF)-এর কর্মীরা সুপরিকল্পিতভাবে তাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। এমনকি এবিভিপির যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতি নিখিল রায়ের ওপর আক্রমণ এবং দলিত ছাত্রদের উদ্দেশ্যে জাতিবিদ্বেষমূলক অশালীন ভাষা প্রয়োগের গুরুতর অভিযোগও উঠেছে। এবিভিপির কেন্দ্রীয় কর্মসমিতির সদস্য শুভব্রত অধিকারী হুংকার ছেড়ে বলেছেন, “এরা দলিত প্রেমের আড়ালে দলিত শিক্ষার্থীদের ওপর নৃশংস হামলা চালিয়েছে। যাদবপুরে আমরা সার্জিক্যাল স্ট্রাইক চালাব, আজ থেকেই কফিনের শেষ পেরেক পোঁতার কাজ শুরু হল।”

অন্যদিকে, ফেটসু এবং এসএফআইয়ের পক্ষ থেকে পাল্টা অভিযোগ করা হয়েছে যে, বহিরাগতদের ক্যাম্পাসে ঢুকিয়ে এই হিংসা চালিয়েছে এবিভিপি। এসএফআইয়ের রাজ্য সম্পাদক দেবাঞ্জন দে অভিযোগ করেন, বিজেপির গুন্ডাবাহিনী নৃশংসভাবে হামলা চালিয়ে অরবিন্দ ভবনে আগুন লাগানোর চেষ্টা করেছে এবং যাদবপুরের মুক্তমনা পরিবেশকে ধ্বংস করার গভীর ষড়যন্ত্র চলছে।

এই জোড়া হানাহানি ও উত্তেজনার জেরে ইতিমধ্যেই যাদবপুর থানায় মোট ১১ জনের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট মামলা দায়ের হয়েছে। এবিভিপি সমর্থক অরিত্র সরকার বাদী হয়ে অভিযোগ দায়ের করেছেন। ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-এর একাধিক কঠোর ধারা এবং তফশিলি জাতি ও উপজাতি (SC/ST) নির্যাতন নিবারণ আইনের ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। উত্তরোত্তর বাড়তে থাকা এই রাজনৈতিক ও ছাত্র অসন্তোষের জেরে গোটা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ব্যাপক থমথমে ও আতঙ্কজনক পরিস্থিতি বিরাজ করছে।