মাস গেলে লাখ টাকার আয়! তা সত্ত্বেও কেন প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা উবার চালাচ্ছেন এই কোটিপতি বাইক চালক?

আজকের যুগে মানুষের জীবনযাত্রা এবং জীবিকার লড়াইয়ের নানা রূপ প্রতিদিন সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে আমাদের সামনে আসে। এর মধ্যে কিছু গল্প এতটাই হৃদয়স্পর্শী এবং অনুপ্রেরণাদায়ক হয় যে তা লাখ লাখ মানুষের মনে গভীর রেখাপাত করে। সম্প্রতি দিল্লির রাজপথে উবার বাইক চালানো এক চালকের জীবনকাহিনি ঠিক এভাবেই নেটপাড়ার সমস্ত নজর কেড়ে নিয়েছে। বিহারের সমস্তিপুরের বাসিন্দা এই ব্যক্তি বর্তমানে জাতীয় রাজধানী দিল্লিতে বাইক চালিয়ে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। শুনতে অবাক লাগলেও এটাই সত্যি যে তিনি শুধুমাত্র উবার চালিয়েই প্রতি মাসে প্রায় ৫০ হাজার টাকা আয় করেন। কিন্তু এই উপার্জনের পেছনের আসল রহস্য বা টুইস্টটি অন্য জায়গায়। অতিরিক্ত টাকা কামানোর লোভ বা আর্থিক অনটনের কারণে তিনি দৈনিক দীর্ঘ বারো ঘণ্টা বাইক চালান না, বরং এর পেছনে রয়েছে এক তীব্র জেদ, আত্মসম্মান এবং জীবনের কঠিন লড়াইয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর এক অদম্য মানসিকতা।
ভাইরাল হওয়া একটি ইনস্টাগ্রাম ভিডিওর সুবাদে এই চাঞ্চল্যকর ও অনুপ্রেরণামূলক তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। আস্থা শেঠ নামক এক কনটেন্ট ক্রিয়েটর এই বাইক চালকের একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করার সঙ্গে সঙ্গেই তা হু হু করে ভাইরাল হয়ে যায়। ভিডিওতে জানা গেছে যে অতীতে এই ব্যক্তি দিল্লির একটি বেসরকারি কারখানায় অত্যন্ত সম্মানজনক পদে চাকরি করতেন। দুর্ঘটনাবশত সেই কারখানাটি ছিল তাঁরই এক নিকট আত্মীয়ের। সেখানে তিনি বেশ ভালো অঙ্কের টাকাই উপার্জন করতেন এবং তাঁর জীবন বেশ সচ্ছলভাবেই কাটছিল। কিন্তু চলতি বছরেই হঠাৎ করে তাঁর ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক হয়। আর ঠিক সেই চরম বিপদের দিনেই তাঁর আপন আত্মীয় তাঁকে কারখানা থেকে নির্মমভাবে ছাঁটাই করে দেন। তাঁকে সরাসরি মুখের ওপর অপমান করে জানিয়ে দেওয়া হয় যে হার্ট অ্যাটাকের পর তিনি আর কোনো কাজের উপযুক্ত নন, তাই তাঁকে আর কারখানায় আসার কোনো প্রয়োজন নেই।
আপন মানুষের এই অপমান এবং চরম বিশ্বাসঘাতকতাই এই ব্যক্তির জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। আত্মীয়ের সেই অবহেলার কথা মনে করে তাঁর জেদ চেপে যায় যে তিনি শারীরিক দিক থেকে অকেজো হয়ে যাননি। নিজের কর্মক্ষমতা এবং আত্মমর্যাদা প্রমাণ করার জন্যই তিনি হারকে জয় করার পণ নেন। জানলে আরও বেশি চমকে যাবেন যে, এই বাইকচালকের আর্থিক অবস্থা কিন্তু মোটেও খারাপ নয়। নয়ডা ইলেকট্রিক সিটির ঠিক পাশেই তাঁর নিজস্ব দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে, যেগুলোর বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৮০ লক্ষ টাকা। সেই ফ্ল্যাটগুলো থেকে প্রতি মাসে মোটা অঙ্কের ভাড়া আসে, যেখান থেকে তাঁর প্যাসিভ ইনকাম বা নিষ্ক্রিয় আয় প্রায় ৮০ হাজার টাকা। এত সম্পদ এবং নিশ্চিত উপার্জনের পথ থাকা সত্ত্বেও তিনি প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত টানা ১২ ঘণ্টা রোদে পুড়ে ও বৃষ্টিতে ভিজে উবার বাইক চালান।
তাঁর এই কঠোর পরিশ্রমের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো সমাজকে এবং সেই আত্মীস্বজনদের এটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া যে, বড় কোনো শারীরিক অসুস্থতা বা হার্ট অ্যাটাক মানেই মানুষের জীবনের সমাপ্তি নয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ঘটনা ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই নেটিজেনরা এই লড়াকু মানুষের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছেন। এক সচেতন নাগরিক মন্তব্য বাক্সে লিখেছেন, “ওঁর এই অদম্য জেদ এবং অসামান্য সাহসকে আমার তরফ থেকে কুর্নিশ জানাই।” অপর এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “এই ধরনের বাস্তব জীবনের গল্পগুলো হতাশাগ্রস্ত যুবসমাজকে নতুন করে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা জোগায়।” সব মিলিয়ে, এই বাইকচালকের আত্মসম্মান ও লড়াকু মানসিকতা প্রমাণ করে যে মনের জোর থাকলে প্রতিকূল পরিস্থিতিকেও সহজেই জয় করা সম্ভব।