মাসির বাড়ি থেকে ফিরছেন মহাপ্রভু! বাহুদা যাত্রার দিনই কেন লক্ষ্মী দেবীকে রসগোল্লা খাওয়ান জগন্নাথদেব?

ওড়িশার পবিত্র পুরীধামে মহাসমারোহে পালিত হচ্ছে রথযাত্রার অন্তিম পর্ব তথা পবিত্র ‘বাহুদা যাত্রা’। আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বাদশী ও ত্রয়োদশী তিথির এই মাহেন্দ্রক্ষণে মাসির বাড়ি গুন্ডিচা মন্দির থেকে নিজের মূল আলয় শ্রীমন্দিরে ফিরে আসছেন মহাপ্রভু জগন্নাথ, জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা বলভদ্র এবং বোন সুভদ্রা দেবী। ওড়িয়া সংস্কৃতি ও সনাতন ঐতিহ্যে বাহুদা যাত্রা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এক উৎসব, যার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু প্রাচীন আচার-অনুষ্ঠান ও লোকবিশ্বাস। দীর্ঘ নয় দিন মাসির বাড়িতে কাটিয়ে মহাপ্রভুর ঘরে ফেরার এই যাত্রাপথে প্রতিদিন নানা নিভৃত ও বর্ণাঢ্য রীতিনীতি পালিত হয়, যা দেখতে দেশ-বিদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ ভক্তের সমাগম ঘটে পুরী শহরের রাজপথে।

গুন্ডিচা মন্দির থেকে শ্রীমন্দিরে প্রত্যাবর্তনের এই পবিত্র যাত্রার প্রাক্কালে মহাপ্রভুকে বেশ কিছু ঐতিহ্যবাহী ও সুস্বাদু খাবার নিবেদন করা হয়। রথে ওঠার ঠিক আগে ভগবান জগন্নাথকে চাল, নারকেল এবং সুস্বাদু গুড় দিয়ে বিশেষভাবে প্রস্তুত করা ঐতিহ্যবাহী ‘পোড়া পিঠা’ ভোগ হিসেবে নিবেদন করা হয়। এই বিশেষ আচার সম্পন্ন হওয়ার পরেই রশিতে টান পড়ে এবং মাসির বাড়ি থেকে মূল মন্দিরের উদ্দেশ্যে ত্রিমূর্তির বাহুদা যাত্রা শুরু হয়। পুরীর শ্রীমন্দিরে ফিরে আসার পর পালিত হয় অত্যন্ত আকর্ষণীয় ‘সূনা বেশ’ বা ‘রাজরাজেশ্বর বেশ’ অনুষ্ঠান। আষাঢ় শুক্ল একাদশীর এই বিশেষ দিনে ভগবান জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা দেবী বহুমূল্য সোনার মুকুট, রাজকীয় হার, কোমরবন্ধনী এবং খাঁটি সোনার হাত ও পা দিয়ে সুসজ্জিত হন। অজস্র স্বর্ণালংকারে ভূষিত হয়ে মহাপ্রভু যখন মূল মন্দিরের সিংহদ্বারের সামনে রথে উপবিষ্ট হয়ে ভক্তদের দর্শন দেন, তখন এক অপার্থিব পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

সোনা বেশের পরবর্তী পবিত্র আচারটি হলো ঐতিহ্যবাহী ‘আধার পানা’। এই বিশেষ দিনে রথের ওপর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আচার সম্পন্ন হয়, যেখানে খাঁটি দুধ, ছানা, চিনি, পাকা কলা এবং নানা ধরনের শুকনো ফল দিয়ে একটি বিশেষ সুস্বাদু ও সুগন্ধি পানীয় বা শরবত প্রস্তুত করা হয়। সুবৃহৎ মাটির পাত্রে তৈরি এই পবিত্র পানীয় সরাসরি ভগবামের শ্রীঠোঁটের কাছে ধরে নিবেদন করা হয় এবং এর পর পাত্রগুলি ভেঙে ফেলা হয়। বিশ্বাস করা হয় যে এই বিশেষ অর্ঘ্যটি মূলত অদৃশ্য আত্মা, মহাশক্তিধর চণ্ডী-চামুণ্ড এবং অন্যান্য পার্শ্ব দেবতাদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়, যা সাধারণ ভক্তরা গ্রহণ করেন না। এই আচারের মাধ্যমেই রথের বিভিন্ন উপাচারে পবিত্রতা রক্ষা করা হয়।

বাহুদা যাত্রার একেবারে অন্তিম পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হয় বহুল প্রতীক্ষিত ‘নীলাদ্রি বিজে’ অনুষ্ঠান, যা আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের ত্রয়োদশীতে সম্পন্ন হয়। এই বিশেষ ও আকর্ষণীয় অনুষ্ঠানে ভগবান জগন্নাথ যখন গর্ভগৃহে ফিরে যান, তখন তাঁর স্ত্রী দেবী লক্ষ্মীর মান ভাঙানোর এক অপূর্ব লৌকিক দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়। টানা নয় দিন স্বামী মন্দির থেকে দূরে মাসির বাড়িতে অবস্থান করায় দেবী লক্ষ্মী অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে থাকেন। কথিত আছে, তাঁর এই অভিমান ও রাগ ভাঙানোর জন্যই ভগবান জগন্নাথ তাঁকে সুস্বাদু রসগোল্লা খাইয়ে সন্তুষ্ট করেন এবং তারপর নিজের মূল সিংহাসনে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হন। এই মিষ্টিমুখ করানোর আনন্দ উৎসবের মাধ্যমেই পুরীর ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রা উৎসবের সফল ও শান্তিপূর্ণ সমাপ্তি ঘটে।