মাটি কাঁপিয়ে নিমেষে সর্বস্ব হারাল কলম্বিয়া! ৭.৪ মাত্রার বিধ্বংসী ভূকম্পনে দেশজুড়ে হাহাকার, পাশে দাঁড়াল বিশ্ব

সোমবার সকালে লাতিন আমেরিকার দেশ কলম্বিয়ার পশ্চিমাংশে আঘাত হেনেছে রিখটার স্কেলে ৭.৪ মাত্রার এক অত্যন্ত শক্তিশালী ও বিধ্বংসী ভূমিকম্প। এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে গোটা দেশটি কার্যত একটি বিশাল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় সময় অনুযায়ী সকাল সাড়ে সাতটা নাগাদ ঘটে যাওয়া এই ভূকম্পনের উৎসস্থল ছিল চোকো বিভাগের সান হোসে দেল পালমারের প্রায় ৫ কিলোমিটার পূর্বে এবং ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৯৬ কিলোমিটার গভীরে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। ভূমিকম্পের তীব্রতা এতটাই মারাত্মক ছিল যে এর শক্তিশালী ঝাঁকুনি ভেনেজুয়েলার সীমান্তবর্তী অঞ্চলেও তীব্রভাবে অনুভূত হয়। রাজধানী বোগোতা ছাড়াও আন্তিওকিয়া, কুন্দিনামার্কা এবং মেটা সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষ চরম আতঙ্কে ঘর ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন। কলম্বিয়া সরকারের সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৩২ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং আহত হয়েছেন অন্তত ৫৭০ জন। এছাড়া ভেঙে পড়া বহুতল ও ছোট বাড়ির ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও বহু মানুষ চাপা পড়ে থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বহুলাংশে বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে কলম্বিয়া সরকার দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা এবং জাতীয় বিপর্যয় ঘোষণা করেছে। বোগোতা থেকে দেশের প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এস্প্রিয়েলা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, উদ্ধার ও ত্রাণকার্য পরিচালনা করার জন্য সরকারের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাকে একযোগে মাঠে নামানো হয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা জীবিত মানুষগুলোকে দ্রুত উদ্ধার করাই বর্তমানে প্রশাসনের প্রধান ও সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এই তীব্র ভূকম্পনে প্রায় ১ হাজার ৫৭১টি বাড়ি সম্পূর্ণভাবে ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৬টি প্রধান বিমানবন্দর, যার ফলে ওই সমস্ত অঞ্চলে বিমান চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়েছে প্রশাসন। পাশাপাশি, স্থানীয় মেয়রদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলোতে প্রয়োজনীয় খাদ্য, ওষুধ ও জরুরি ত্রাণসামগ্রী পাঠানোর কাজ জোরকদমে চলছে।
এই আন্তর্জাতিক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর কলম্বিয়ার পাশে দাঁড়িয়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রভাবশালী রাষ্ট্র। আমেরিকার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে ট্রাম্প প্রশাসন এই পরিস্থিতি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং কলম্বিয়ার জনগণের পাশে থাকতে ১৫.৫ মিলিয়ন ডলারের জরুরি তহবিল বরাদ্দ করেছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ, ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির জেলেনস্কি এবং ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্ট দানিয়েল নোবোয়া আজিন প্রত্যেকেই তাঁদের অফিসিয়াল সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেছেন। এর মধ্যে ইকুয়েডর সরকার ৪৭ জন প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জামসহ একটি বিশেষ ইউএসএআর (USAR) টিম কলম্বিয়ায় পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে, যা টানা সাত দিন স্বয়ংক্রিয়ভাবে উদ্ধারকাজ চালাতে সক্ষম। আন্তর্জাতিক সাহায্যের এই স্রোতের মাঝেও প্রিয়জন হারানোর বেদনা এবং সর্বহারা হওয়ার কান্নায় ভারী হয়ে রয়েছে কলম্বিয়ার আকাশবাতাস।