মহালয়ার চেনা কণ্ঠকে অমর করার ঐতিহাসিক দাবি! বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের জন্মবার্ষিকীতে বড় ঘোষণা

বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র বাঙালির চিরকালীন আবেগের নাম। মহালয়ার ভোরে তাঁর জাদুকরী কণ্ঠেই ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ শুনে ঘুম ভাঙে বাঙালির। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে তাঁর কণ্ঠস্বর ও শৈল্পিক সত্তা আমাদের সংস্কৃতির অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে। এহেন প্রবাদপ্রতিম বেতার ব্যক্তিত্ব বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের ১২২তম জন্মবার্ষিকীতে তাঁর উত্তর কলকাতার বাড়িতে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের স্মরণে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবের কথা প্রকাশ্যে আনেন।
কালজয়ী এই শিল্পীর পরিবারের পক্ষ থেকেই মূলত এই প্রস্তাবগুলি পেশ করা হয়েছে। যার মধ্যে প্রথমত দাবি তোলা হয়েছে, শ্যামবাজার মেট্রো স্টেশনের নাম পরিবর্তন করে প্রবাদপ্রতিম বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের নামে নামকরণের ব্যবস্থা করা হোক। দ্বিতীয়ত, কলকাতার আকাশবাণী ভবনের ভিতরে এই কিংবদন্তি বেতার শিল্পীর একটি আবক্ষ মূর্তি স্থাপন করা অত্যন্ত জরুরি। রাজ্যের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল এই সমস্ত প্রস্তাবে পূর্ণ সহমত পোষণ করেছেন। তিনি কিংবদন্তির পরিবারকে আশ্বাস দিয়ে জানান যে, এই প্রস্তাব দুটি সহ বীরেন্দ্রকৃষ্ণের শ্যামবাজারের ঐতিহাসিক বাড়িটিকে হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণা করার প্রয়োজনীয় দাবির কথাও তিনি মুখ্যমন্ত্রীকে জানাবেন। তবে শেষ পর্যন্ত এই দাবিগুলি বাস্তবায়িত হবে কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত করে এখনই কিছু জানাননি।
এই বিষয়ে কতটা আশাবাদী বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রর পরিবার? ইটিভি ভারত কথা বলেছিল বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের দৌহিত্র শমিত সোমের সঙ্গে। তিনি প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন যে এই প্রস্তাবটি মূলত তাঁদের পরিবারের পক্ষ থেকেই রাখা হয়েছিল। পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী এই সংবেদনশীল বিষয়ে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন, এটাই অনেক বড় প্রাপ্তি। তিনি শ্যামবাজারের পৈতৃক বাড়িটিকে হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণা করার প্রস্তাবও মুখ্যমন্ত্রীকে দেবেন বলে জানিয়েছেন, যা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। পরিবারের সদস্যরা এই নিয়ে ভীষণ আশাবাদী। তবে তাঁদের মতে, এই কাজগুলি আরও অনেক আগে হওয়া উচিত ছিল। আজ যদি তা বাস্তবায়িত হয়, তবে পরিবার হিসেবে তাঁরা অত্যন্ত আনন্দিত হবেন।
১৯০৫ সালের ৪ অগস্ট আহিরীটোলায় জন্ম হয়েছিল প্রখ্যাত বেতার শিল্পী বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের। এক শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তাঁর কণ্ঠস্বর আজও বাঙালির দুর্গাপুজোর নস্ট্যালজিয়া ও আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজো আর বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র একে অপরের পরিপূরক। বাংলায় পালাবদলের পর বর্তমান সরকার বাংলার দিকপাল মনীষী ও শিল্পী-সাহিত্যিকদের ঐতিহ্য রক্ষায় বাড়তি উদ্যোগে শামিল হয়েছে। অতীতে কিংবদন্তি বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের জন্মদিন এইভাবে সরকারিকভাবে জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদযাপিত হয়নি। তবে এবার তাঁর জন্মদিনে স্বয়ং ক্যাবিনেট মন্ত্রী সশরীরে তাঁর রামধন মিত্র লেনের বাড়িতে পৌঁছে যান। যা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে বর্তমান সরকার সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও শিল্পীদের ঐতিহ্য রক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
ইতিমধ্যেই এই সম্ভাবনা নিয়ে সংস্কৃতিপ্রেমী মহলে ইতিবাচক আলোচনা শুরু হয়েছে। এর আগে প্রবাদপ্রতিম বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের বর্ণময় জীবন অবলম্বনে বাংলা ছবিও বড় পর্দায় মুক্তি পেয়েছিল, যেখানে তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকায় নজর কেড়েছিলেন বিশিষ্ট অভিনেতা শুভাশিস মুখোপাধ্যায়। এখন দেখার বিষয় হল, সাধারণ মানুষ ও অনুরাগীদের দীর্ঘদিনের চাওয়া মতো শ্যামবাজার মেট্রো স্টেশনের নাম বদল, আকাশবাণী ভবনে তাঁর মূর্তি স্থাপন এবং তাঁর বাড়ি হেরিটেজ মর্যাদা পায় কি না। সমস্ত বিষয়গুলি এখন পুরোপুরি রাজ্য সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে এবং এর স্থায়ী সমাধানের দিকে তাকিয়ে রয়েছে আপামর বাঙালি সমাজ।