মহাকাশে ফের ইতিহাস গড়তে চলেছেন অনিল মেনন! নাসা নভোচারীর দ্বিতীয় স্পেসওয়াক নিয়ে উত্তেজনা তুঙ্গে

মহাকাশ বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক নতুন ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় যোগ করতে চলেছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত বিশিষ্ট নাসা (NASA) মহাকাশচারী অনিল মেনন। আগামী ১৮ আগস্ট, মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের (ISS) বাইরে নিজের জীবনের দ্বিতীয় ‘স্পেসওয়াক’ বা মহাকাশে হাঁটার রোমাঞ্চকর অভিযানে নামছেন তিনি। এই ঐতিহাসিক মিশনে তাঁর সহযাত্রী হিসেবে থাকবেন ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার (ESA) মেধাবী মহাকাশচারী সোফি আদিওনত। এটি সোফির মহাকাশ জীবনের প্রথম স্পেসওয়াক হলেও, এই বিশেষ অভিযানের মাধ্যমেই প্রথম ফরাসি নারী হিসেবে মহাকাশে হাঁটার বিরল ও গৌরবময় রেকর্ড গড়তে চলেছেন তিনি। উল্লেখ্য, মহাকাশ স্টেশনের বাইরে সম্প্রতি একটি বৃহৎ পাওয়ার-সিস্টেম আপগ্রেড সম্পন্ন হওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এই হাই-ভোল্টেজ অভিযানটি শুরু হতে চলেছে।

এই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও জটিল স্পেসওয়াকের মূল লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ পুনরুজ্জীবিত করা। বর্তমানে স্টেশনের বাইরে থাকা একটি অকেজো ‘স্পেস-টু-গ্রাউন্ড অ্যান্টেনা’ বদলে ফেলে সেখানে একটি নতুন অতিরিক্ত অ্যান্টেনা স্থাপন করা হবে। এই বিশেষ অ্যান্টেনাটিই মূলত মহাকাশ স্টেশন এবং আমেরিকার হিউস্টনে অবস্থিত মূল ‘মিশন কন্ট্রোল’-এর মধ্যে উচ্চগতির ডেটা আদান-প্রদান ও নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ স্থাপন এবং বজায় রাখতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে। পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, দুই মহাকাশচারী স্টেশনের ‘জেড-ওয়ান ট্রাস’ অংশ থেকে পুরোনো অকেজো অ্যান্টেনাটি অত্যন্ত সুনিপুণভাবে খুলে নিয়ে বাইরের একটি নির্ধারিত প্ল্যাটফর্মে সাময়িকভাবে জমা রাখবেন এবং সেই স্থানে নতুন স্পেয়ার অ্যান্টেনাটি প্রতিস্থাপন করবেন। মহাকাশের চরম প্রতিকূল ও শূন্য পরিবেশের মধ্যে টানা সাড়ে ছয় ঘণ্টা ধরে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে চলবে এই জটিল ও বৈজ্ঞানিক কাজ।

অভিযানটি সফলভাবে সম্পন্ন করতে বেশ কয়েকজন অভিজ্ঞ মহাকাশচারীর এক চমৎকার ও নিপুণ যৌথ প্রচেষ্টা দেখতে পাবেন বিশ্ববাসী। স্পেসওয়াকের বিপজ্জনক মুহূর্তে অনিল মেনন মহাকাশ স্টেশনের বিশাল রোবোটিক বাহু ‘ক্যানাডার্ম২’ (Canadarm2)-এ সওয়ার হয়ে অ্যান্টেনা পরিবর্তনের মূল দায়িত্ব পরিচালনা করবেন। অন্যদিকে, সোফি নিজেকে স্টেশনের সঙ্গে নিরাপত্তার মজবুত রশিতে বেঁধে রেখে অনিলকে সার্বিকভাবে সহায়তা করবেন। স্টেশনের ভেতর থেকে রোবোটিক আর্মটি নিয়ন্ত্রণের মূল দায়িত্বে থাকবেন দক্ষ নাসা মহাকাশচারী জ্যাক হ্যাথাওয়ে। পাশাপাশি, জ্যাক এবং অপর এক প্রবীণ মহাকাশচারী জেসিকা মেয়ার অনিল ও সোফিকে জটিল ও ভারী স্পেসস্যুট পরা এবং তা খোলার কাজে সরাসরি সাহায্য করবেন। উল্লেখ্য, এর আগে গত ৬ আগস্ট ‘ইউএস স্পেসওয়াক ৯৬’ অভিযানে জেসিকা মেয়ারের সাথেই নিজের প্রথম স্পেসওয়াক সফলভাবে সম্পন্ন করেছিলেন অনিল মেনন, যেখানে তাঁরা দীর্ঘ ৬ ঘণ্টা ২৭ মিনিট কাজ করে ভবিষ্যৎ সোলার অ্যারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘৩বি পাওয়ার চ্যানেল’ প্রস্তুত করেছিলেন।

আসন্ন এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মিশনটির পোশাকি নাম দেওয়া হয়েছে ‘ইউএস স্পেসওয়াক ৯৭’। বিজ্ঞানের ভাষায় মহাকাশের শূন্যতায় এই বিশেষ কাজকে ‘এক্সট্রা ভেহিকুলার অ্যাক্টিভিটি’ বা ইভিএ (EVA) বলা হয়, যা নিরাপদে সম্পন্ন করতে প্রয়োজন হয় অত্যাধুনিক সুরক্ষা ব্লকের। নভোচারীদের পরিধান করা জটিল এই বিশেষ স্যুটগুলিই তাঁদের মহাকাশের চরম শূন্যতায় অক্সিজেন প্রদান, বায়ুমণ্ডলীয় চাপ নিয়ন্ত্রণ, উপযুক্ত তাপমাত্রা বজায় রাখা এবং মারাত্মক প্রাণঘাতী সৌর বিকিরণ থেকে সুরক্ষা প্রদান করে। ইতিমধ্যেই সমস্ত নভোচারী এই অভিযানের প্রতিটি পদক্ষেপের পুঙ্খানুপুঙ্খ মক ড্রিল বা মহড়া শেষ করেছেন, তাঁদের স্পেসস্যুটগুলি পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা করেছেন এবং অ্যান্টেনা বদলের সমস্ত প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সুসজ্জিত করে ফেলেছেন। নাসা সূত্রে জানানো হয়েছে, আগামী ১৮ আগস্ট ভারতীয় সময় বিকেল ৪টে ৩০ মিনিট থেকে এই ঐতিহাসিক ঘটনার লাইভ সম্প্রচার শুরু হবে এবং সন্ধ্যা আনুমানিক ৬টা ০৫ মিনিটে মূল স্পেসওয়াক শুরু হবে, যার একমাত্র লক্ষ্য আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের নিরবচ্ছিন্ন ও উচ্চগতির যোগাযোগ পরিকাঠামো চিরতরে সুনিশ্চিত করা।