মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর হামলা নিয়ে বিস্ফোরক দাবি শিবসেনার! ‘সামনা’র সম্পাদকীয়তে কোন বড় হুঁশিয়ারি?

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর কথিত আক্রমণ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক এখন চরমে উঠেছে। নিজেদের মুখপত্র ‘সামনা’-তে শিবসেনা (উদ্ধব ঠাকরে) এই ঘটনাকে গণতন্ত্রের প্রতি একটি অত্যন্ত গুরুতর ও সুদূরপ্রসারী হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেছে। দলটি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছে যে একজন বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতার উপর সংঘটিত এই গণ-আক্রমণ কেবল কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত বিবাদ হতে পারে না, বরং এটি সরাসরি দেশের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে।
সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শিবসেনা (ইউবিটি) তাদের মুখপত্র ‘সামনা’র প্রকাশিত এক তীব্র আক্রমণাত্মক সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করেছে যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই যাত্রায় প্রাণে বেঁচে যাওয়াটা নেহাতই একটি কাকতালীয় ঘটনা মাত্র। সম্পাদকীয়র তথ্য অনুযায়ী, পাথর, লাঠি ও লোহার রডের মতো মারাত্মক অস্ত্রে সজ্জিত একদল উচ্ছৃঙ্খল জনতা তাঁর কনভয় ও গাড়িটিকে ঘিরে ফেলেছিল। দলটির জোরালো দাবি, এই হামলার মূল উদ্দেশ্য ছিল একটি শক্তিশালী বিরোধী কণ্ঠস্বরকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া। শিবসেনা স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনৈতিক হিংসা এখন এমন এক চরম সীমায় পৌঁছে গেছে যা কোনো সভ্য ও গণতান্ত্রিক সমাজে এক ফোঁটাও গ্রহণযোগ্য নয়। দলটির মতে, সুস্থ রাজনৈতিক মতপার্থক্য সম্পূর্ণ বৈধ, কিন্তু হিংসাকে কখনোই রাজনৈতিক সংগ্রামের হাতিয়ার বা পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে না।
সামনা পত্রিকার এই বিশেষ সম্পাদকীয়তে রাজ্যের সামগ্রিক ও পরিবর্তিত রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতির ওপর অত্যন্ত গভীরভাবে আলোকপাত করা হয়েছে। সম্পাদকীয়তে সুনির্দিষ্টভাবে দাবি করা হয়েছে যে তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতাদের ক্রমাগত টার্গেট করা হচ্ছে এবং এই প্রসঙ্গে অভিষেক ব্যানার্জী ও কল্যাণ ব্যানার্জীর মতো প্রভাবশালী নেতাদের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। শিবসেনা কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য রাজনীতির আপাত ও স্ববিরোধী বৈপরীত্য নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে। দলটি তীব্র ভাষায় বলেছে যে একদিকে যখন দাগী দলত্যাগী নেতাদের অত্যন্ত সমাদরে স্বাগত জানানো হচ্ছে, অন্যদিকে ঠিক তখনই রাজ্যে যাদের গভীর রাজনৈতিক ভিত্তি ও জনভিত্তি রয়েছে, সেই সমস্ত নেতারাই একের পর এক আক্রমণের শিকার হচ্ছেন।
ঠাকরে শিবির তাদের এই সম্পাদকীয়তে কেন্দ্রীয় সরকারের পূর্ববর্তী ভূমিকা ও আইনশৃঙ্খলার অবনতি নিয়েও তীব্র ভর্ৎসনা করেছে। ‘সামনা’র বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অতীতে পশ্চিমবঙ্গে আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতির কথা উল্লেখ করে খোদ কেন্দ্রীয় সরকার নিজ দায়িত্বে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছিল। সম্পাদকীয়তে বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক প্রাক্কালে বিপুল সংখ্যক কেন্দ্রীয় আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করার প্রসঙ্গও অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়েছে। শিবসেনা সরাসরি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে যে, যখন চারিদিক থেকে রাজনৈতিক হিংসা ও অশান্তি বৃদ্ধির খবর পাওয়া যাচ্ছিল, ঠিক সেই একই তৎপরতা ও ভূমিকা কেন এবার দেখা গেল না? দলটির মতে, এটি নীতিহীন দ্বৈত আচরণের এক স্পষ্ট লক্ষণ। সম্পাদকীয়তে কঠোর ভাষায় বলা হয়েছে যে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে রাজপথে এ ধরনের প্রকাশ্য সহিংসতা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এক চরম উদ্বেগের বিষয়।
একে নিছক ‘রাজনৈতিক লড়াই’ বলে দায় এড়ানো যে অত্যন্ত অন্যায়, সেকথাও সামনাতে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। শিবসেনা জানিয়েছে যে, একজন প্রবীণ রাজনৈতিক নেতার উপর হওয়া এই সশস্ত্র হামলাকে কেবল সাধারণ জনগণ ও একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের মধ্যকার রূঢ় লড়াই হিসেবে চালিয়ে দেওয়া মারাত্মক ভুল। দলটির জোরালো যুক্তি হলো, এ ধরনের আপসকামিতা বা ভাষা গণ-সহিংসতাকে প্রকারান্তরে বৈধতা দেওয়ারই শামিল। শিবসেনা আরও যুক্তি দিয়ে বুঝিয়েছে যে প্রতিটি সাধারণ প্রতিবাদ বা রাজনৈতিক বিরোধিতাকে নাগরিক ও নেতার মধ্যকার ব্যক্তিগত সংঘাত হিসেবে গণ্য করা হলে রাষ্ট্রের শাসনের মৌলিক জবাবদিহিতা মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে।
গণতন্ত্রে ক্ষমতার চূড়ান্ত ফায়সালা কেবল নির্বাচন এবং ব্যালট বাক্সের মাধ্যমেই হওয়া উচিত বলে উদ্ধব ঠাকরের নেতৃত্বাধীন দল মত প্রকাশ করেছে। দলটির পরিষ্কার অভিমত হলো, সমস্ত রাজনৈতিক দলেরই উচিত খেলার নিয়মে জয়-পরাজয় মাথা পেতে মেনে নেওয়া এবং একই সঙ্গে সাংবিধানিক সুশাসন ও জবাবদিহিতাকে সর্বোচ্চ সম্মান জানানো। সম্পাদকীয়তে সাম্প্রতিক ছাত্র বিক্ষোভ এবং বিরোধী নেতাদের বিরুদ্ধে লাগাতার বলপ্রয়োগের গুরুতর অভিযোগগুলোর কথাও সমানভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। শিবসেনা সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, ভিন্নমত বা প্রতিবাদের কণ্ঠকে রোধ করতে সহিংসতার আশ্রয় নেওয়া সামগ্রিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ভেতর থেকে পঙ্গু ও দুর্বল করে দেয়।
পরিশেষে, ঠাকরে শিবির তাদের সম্পাদকীয়তে বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়েও যথেষ্ট কড়া মন্তব্য করেছে। দলটি অত্যন্ত শক্ত ভাষায় বলেছে যে, বিরোধী দলকে গণতন্ত্রের একটি অপরিহার্য ও সহায়ক অংশ হিসেবে না দেখে, যদি তাদের নির্মূল করার মতো শত্রু হিসেবে দেখা হয়, তবে কোনোমতেই গণতন্ত্র শক্তিশালী থাকতে পারে না। শিবসেনা আরও দাবি করেছে যে, কোনো ধরনের আইনি পরিণতির ভয় বা বাধা ছাড়াই সহিংস শক্তিকে নিজের মতো করে কাজ করার লাইসেন্স দেওয়া কোনো দায়িত্বশীল সরকারের ক্ষমতার বাইরে থাকা উচিত নয়। দলটির মতে, এ ধরনের বিপজ্জনক পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত সেই সমস্ত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেই ধুলিস্যাৎ করে দেয়, যার ওপর গোটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে রয়েছে। বর্তমানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর কথিত এই হামলাকে কেন্দ্র করে বাংলার রাজনীতিতে অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের অন্তহীন ঝড় বইছে, এবং শিবসেনার এই সম্পাদকীয় সেই আগুনে নতুন করে ঘি ঢেলেছে।