মন খারাপের দিনে কেন বারবার কষ্টের গানই শুনতে ইচ্ছে করে? জানুন এর পেছনের অবাক করা বিজ্ঞান!

মন খারাপ, অফিসে বকা খাওয়া কিংবা প্রিয় মানুষের সাথে কোনো কারণে ঝগড়া—এমন পরিস্থিতিতে বেশিরভাগ মানুষই প্লে-লিস্টে খুঁজে নেন কোনো বিয়োগান্তক বা কষ্টের গান। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, মন খারাপের সময় আনন্দের গান শুনলে মন ভালো হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে মানুষ উল্টোটা করে। বিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞান বলছে, এই আচরণের পেছনে রয়েছে গভীর কিছু মনস্তাত্ত্বিক কারণ।

প্রথমত, কষ্টের গান আমাদের মনে এক ধরনের আত্মিক সংযোগ তৈরি করে। একা থাকার অনুভূতি যখন গ্রাস করে, তখন কোনো বেদনাবিধুর গানের লিরিক্স বা কথা আমাদের ব্যক্তিগত পরিস্থিতির সাথে হুবহু মিলে যায়। তখন অবচেতন মনেই এই সান্ত্বনা কাজ করে যে, এই পৃথিবীতে এই কষ্ট একা শুধু আমার একার নয়, আরও অনেকেই এই যন্ত্রণার মুখোমুখি হয়েছেন। গায়ক বা গীতিকার যেন আমাদের না বলা কথাই সুরের জাদুতে ফুটিয়ে তুলছেন। এই ‘আমিও আছি’ কিংবা সমবেদনার অনুভূতি আমাদের তীব্র একাকীত্বকে অনেকটাই লাঘব করে।

দ্বিতীয়ত, মস্তিষ্কের রসায়ন এই ক্ষেত্রে এক বিরাট ভূমিকা পালন করে। বিজ্ঞানসম্মত গবেষণায় দেখা গেছে যে, কষ্টের গান বা সুর শুনলে মানুষের মস্তিষ্কে প্রোল্যাকটিন নামক হরমোন নিঃসারিত হয়। এই বিশেষ হরমোন সাধারণত দুঃখ বা কান্নার সময় শরীরকে শান্ত করতে সাহায্য করে এবং এক অদ্ভুত মানসিক সান্ত্বনা জুগিয়ে দেয়। এর পাশাপাশি, মস্তিষ্কে ডোপামিনের মতো ভালো লাগার হরমোনেরও মৃদু নিঃসরণ ঘটে, যা মনকে শান্ত ও স্থির করতে সাহায্য করে। এই কারণেই অনেক সময় কাঁদতে কাঁদতে বা কষ্টের গান শুনতে শুনতে অদ্ভুত এক ধরনের মানসিক প্রশান্তি বা আরাম অনুভূত হয়।

তৃতীয়ত, কষ্টের গান আবেগ প্রকাশের একটি নিরাপদ ও সুন্দর মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। আমাদের সমাজে সবসময় প্রকাশ্যে কান্না করা বা মনের গভীরের দুঃখ প্রকাশ করা সবসময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। বেদনাবিধুর গান সেই চাপা পড়া আবেগগুলোকে বাইরে বের করে আনার একটি নিরাপদ জানালা তৈরি করে দেয়। গানের সুরের সাথে গলা মিলিয়ে বা নীরবে দু-ফোঁটা চোখের জল ফেললে কেউ বিচার করতে আসে না। গান শেষ হওয়ার পর বুকের ভেতর জমে থাকা ভার অনেকটাই হালকা হয়ে যায়। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘ইমোশনাল ক্যাথারসিস’ বা আবেগের শুদ্ধিকরণ।

তাই পরের বার মন খারাপের মুহূর্তে অরিজিৎ সিং বা কোনো মনকে নাড়া দেওয়া দুঃখের গান শুনতে ইচ্ছে করলে নিজেকে কখনই আটকাবেন না। এটি আপনার মনকে বিষণ্ণ করে তুলছে না, বরং আপনার মন নিজেই নিজের ক্ষত সারিয়ে তোলার এক প্রাকৃতিক নিরাময় প্রক্রিয়া চালাচ্ছ।