“ভুলবশত মুছে দেওয়া হয়েছিল!” ফেসবুক থেকে নরেন্দ্র মোদির রিল উধাও হওয়ার ঘটনায় সাফাই দিল মেটা

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম থেকে মুছে (Remove) দেওয়ার নজিরবিহীন ঘটনায় কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে শেষ পর্যন্ত নিঃশর্ত ক্ষমা চাইল জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া জায়ান্ট মেটা (Meta)। একই সঙ্গে, তাদের তরফে মুছে ফেলা ওই ভিডিওটি পুনরায় রিস্টোর (Restore) করা হয়েছে এবং বর্তমানে সেটি ফেসবুক প্ল্যাটফর্মে সকলের দেখার জন্য উন্মুক্ত রয়েছে।

ঠিক কী ঘটনা ঘটেছিল?
বিগত বেশ কিছুদিন ধরে দিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি (CJP)-র নেতৃত্বে দেশজুড়ে ব্যাপক আন্দোলন ও বিক্ষোভ চলছিল। এই উত্তাল পরিস্থিতি দক্ষতার সঙ্গে সামাল দেওয়ার উদ্দেশ্যে গত ২৩ জুলাই রাতে ইনস্টাগ্রামে একটি বিশেষ রিল আপলোড করেছিলেন খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ঠিক একই রিলটি তাঁর অফিশিয়াল ফেসবুক পেজেও শেয়ার করা হয়েছিল। ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ওই রিলটি কয়েকশো মিলিয়ন ভিউয়ের মাইলফলক ছুঁয়ে ফেলে। কিন্তু এর ঠিক বিপরীতেই ফেসবুকে মোদির সেই রিলটি হঠাৎ করেই ব্লক করে দেওয়া হয়, যার জেরে দেশজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। প্রশ্ন উঠতে শুরু করে যে, কোন গোপন কারণে বা কাদের নির্দেশে হঠাৎ করে খোদ দেশের প্রধানমন্ত্রীর রিল সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্লক করা হলো?

ভাইরাল হওয়া সেই ভিডিওর মূল বিষয়বস্তু কী ছিল?
বিতর্কিত ওই ভিডিওটিতে প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীর উদ্দেশে অত্যন্ত স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে, সম্প্রতি ঘটে যাওয়া বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস বা পেপার লিক ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যে বা যাঁরা জড়িত রয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে সরকারের পক্ষ থেকে অত্যন্ত কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পাশাপাশি, এই সংকট উত্তরণে জরুরি ক্যাবিনেট বৈঠক করার সিদ্ধান্তের কথাও সেই ভিডিওর মাধ্যমে জানানো হয়েছিল। এমনকি আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের সমস্ত রকম বিক্ষোভ তুলে নিয়ে ক্লাসে বা ঘরে ফিরে যাওয়ার আবেদনও জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী।

কেন্দ্রের কঠোর পদক্ষেপ ও পরবর্তী পরিস্থিতি:
প্রধানমন্ত্রীর অফিসিয়াল ভিডিও এভাবে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে আচমকা রিমুভ করার তীব্র খবর প্রকাশ্যে আসতেই নড়েচড়ে বসে কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রক (MeitY)। সঙ্গে সঙ্গে কড়া পদক্ষেপ নিয়ে মেটার গ্লোবাল পাবলিক পলিসির প্রধানকে তলব করা হয়। মন্ত্রকের পক্ষ থেকে সরাসরি জানতে চাওয়া হয় যে, ঠিক কোন নিয়মের জেরে এবং কার নির্দেশে প্রধানমন্ত্রীর এই রিল ব্লক করা হলো?

এই গোটা বিষয়ে মুখ খুলে মেটার একজন সরকারি মুখপাত্র প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়াকে দেওয়া এক বিবৃতিতে স্পষ্ট ভাষায় জানান, “যে কন্টেন্ট বা ভিডিওটি নিয়ে এত বিতর্ক, তা আসলে সম্পূর্ণ ভুলবশত (In error) আমাদের সিস্টেম থেকে রিমুভ হয়ে গিয়েছিল। বিষয়টি নজরে আসার পরই তা আবার আগের মতো রিস্টোর করে দেওয়া হয়েছে।” জানা গিয়েছিল, যখন ভিডিওটি ফেসবুক থেকে ব্লক করা হয়েছিল, তখন তার নিচে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল—’আইনি জটিলতার কারণে ভিডিওটি ব্লক করা হচ্ছে’। তবে পরবর্তীতে মেটা একে নিছক একটি ‘প্রযুক্তিগত ভুল’ বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা করেছে।

ছাত্র আন্দোলনে সোশ্যাল মিডিয়ার জোরালো ভূমিকা:
বিশেষজ্ঞ মহলের একাংশের মতে, দীর্ঘ প্রায় ৩৬ দিন ধরে চলা এই লাগাতার ছাত্র আন্দোলনে সোশ্যাল মিডিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেছে। তাঁদের দাবি, মূলধারার বা চিরাচরিত গোত্রীয় মিডিয়াতে যে সমস্ত চাঞ্চল্যকর ফুটেজ বা প্রকৃত চিত্র অনেক সময়ই এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে, সাধারণ কনটেন্ট ক্রিয়েটররা ঠিক সেই সমস্ত তথ্যই সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেছেন।

তবে এর অন্য একটি অন্ধকার দিকও রয়েছে। অপর অংশের বিশেষজ্ঞদের জোরালো দাবি, বিভিন্ন আসল ও জোরালো কনটেন্টের পাশাপাশি এই আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে প্রচুর পরিমাণে জাল, ভুয়ো (Fake) এবং এআই-জেনারেটেড (AI-generated) বিভ্রান্তিকর কন্টেন্টও সোশ্যাল মিডিয়ায় দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। যেমন, সম্প্রতি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পীযূষ গয়ালের একটি এআই-জেনারেটেড ভিডিও নিয়ে দেশজুড়ে এক বিরাট বিভ্রান্তি ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছিল।

বিশেষজ্ঞদের এই দুই ভিন্ন মতামত থাকলেও তাঁরা একটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে সম্পূর্ণ একমত। তাঁদের জোরালো ধারণা, গ্লোবাল পাবলিক পলিসি প্রধানকে দিল্লি ডেকে পাঠানোর পিছনে কেবল প্রধানমন্ত্রীর একটিমাত্র ভিডিও ব্লকিংয়ের কারণটিই একমাত্র ছিল না; বরং দুই পক্ষের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে আগামী দিনে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভুয়ো এবং এআই-জেনারেটেড কনটেন্ট রোধ করার কঠোর উপায়গুলি নিয়েও দীর্ঘক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে।