ভুল ফর্ম নির্বাচন থেকে শুরু করে তথ্য গোপন! অ্যাসেসমেন্ট ইয়ার ২০২৬-২৭-এর আইটিআর জমা দেওয়ার আগে কোন ভুলগুলি এড়াবেন?

অ্যাসেসমেন্ট ইয়ার ২০২৬-২৭-এর জন্য আয়কর রিটার্ন (ITR) জমা দেওয়ার শেষ দিন আগামী ৩১ জুলাই। শেষ মুহূর্তের এই সময়ে দেশের লক্ষ লক্ষ করদাতা তাঁদের আইটিআর ফাইল করার শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত রয়েছেন। তবে মনে রাখবেন, তাড়াহুড়ো করে আইটিআর ফাইল করতে গিয়ে সামান্য একটি ছোট ভুলও আপনার জন্য বড় ধরনের আইনি ও আর্থিক সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এর জেরে আপনাকে বড় অঙ্কের জরিমানা, রিফান্ড পেতে দীর্ঘ বিলম্ব, এমনকি সরাসরি আয়কর দফতরের শো-কজ বা নোটিসের মুখোমুখি হতে হতে পারে। কর বিশেষজ্ঞদের জোরালো মত অনুযায়ী, আইটিআর জমা দেওয়ার আগে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যাচাই করে নিলে এই ধরনের অনভিপ্রেত ঝামেলা খুব সহজেই এড়ানো সম্ভব।

চলুন এক নজরে দেখে নেওয়া যাক আইটিআর ফাইল করার আগে যে ৯টি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আপনার অবশ্যই মাথায় রাখা উচিত:

১. সঠিক ITR ফর্ম নির্বাচন করা:
আপনার আয়ের ধরন ও উৎস অনুযায়ী নির্দিষ্ট আইটিআর ফর্ম রয়েছে (যেমন- ITR-1, ITR-2 ইত্যাদি)। ভুল ফর্ম ব্যবহার করে রিটার্ন দাখিল করলে তা আয়কর দফতরের নিয়মে ‘ডিফেক্টিভ’ বা ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে গণ্য হতে পারে, যার ফলে সম্পূর্ণ প্রসেসিং প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

২. পুরনো ও নতুন কর ব্যবস্থার (Tax Regime) সঠিক চয়ন:
আপনার বার্ষিক আয় এবং বিভিন্ন কর ছাড়ের (Deductions) সুবিধা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিবেচনা না করে ভুল ট্যাক্স রেজিম বা কর ব্যবস্থা বেছে নিলে আপনাকে অপ্রয়োজনে অতিরিক্ত করের বোঝা বইতে হতে পারে। তাই নিজের জন্য কোনটি লাভজনক তা যাচাই করেই নির্বাচন করুন।

৩. ব্যক্তিগত তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই:
আপনার রিটার্নে দেওয়া ব্যক্তিগত তথ্য যেমন—প্যান (PAN), ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর, আইএফএসসি (IFSC) কোড এবং অন্যান্য যোগাযোগের বিবরণ নিখুঁত হওয়া বাধ্যতামূলক। সামান্য ভুল থাকলেই আপনার প্রাপ্য ট্যাক্স রিফান্ড পেতে তীব্র দেরি হতে পারে।

৪. Form 16, Form 26AS এবং AIS-এর তথ্য মিলিয়ে দেখা:
আয়কর পোর্টালে ইতিমধ্যে উপলব্ধ প্রি-ফিলড তথ্যের সঙ্গে আপনার Form 16, Form 26AS এবং অ্যানুয়াল ইনফরমেশন স্টেটমেন্ট (AIS)-এর তথ্য একে অপরের সঙ্গে নিখুঁতভাবে মিলিয়ে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এতে তথ্যের অসঙ্গতি কমে এবং পরবর্তী সময়ে আয়কর দফতরের নোটিস পাওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ হ্রাস পায়।

৫. সমস্ত আয়ের উৎস সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা:
আইটিআর-এ কেবল বেতনের আয়ের কথা উল্লেখ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। বাড়ি ভাড়ার আয়, ব্যবসা থেকে আয়, ব্যাংকের জমানো টাকার সুদ কিংবা অন্য যে কোনো বৈধ উপায়ে আসা আয়ের সঠিক তথ্য প্রদর্শন করা বাধ্যতামূলক। কোনো আয়ের উৎস গোপন করলে নোটিস, জরিমানা ও অতিরিক্ত সুদের মুখে পড়তে হতে পারে।

৬. অযোগ্য কর ছাড় (Deduction) দাবি না করা:
যে সমস্ত ছাড় বা ডিডাকশনের জন্য আপনি আইনগতভাবে যোগ্য নন, সেগুলির অসত্য দাবি ভুলেও করবেন না। এর ফলে অতিরিক্ত কর, ভারী জরিমানা এবং আইনি জট তৈরি হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে।

৭. অন্যান্য আয় যেমন এফডি সুদ বা ক্যাপিটাল গেইন এড়িয়ে না যাওয়া:
ফিক্সড ডিপোজিট বা এফডি-র (FD) ওপর প্রাপ্ত সুদ, শেয়ার বাজার বা সম্পত্তি বিক্রির ক্যাপিটাল গেইন কিংবা ফ্রিল্যান্সিং বা ব্যবসার আয় কখনোই এড়িয়ে যাবেন না। এই সমস্ত তথ্য সরাসরি আপনার প্যান কার্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাই এগুলির উল্লেখ না করলে তা সহজেই আয়কর দফতরের নজরে চলে আসে।

৮. শুধুমাত্র Form 16-এর ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর না করা:
মনে রাখবেন, Form 16-এ মূলত কেবল আপনার বেতন এবং নিয়োগকর্তা কর্তৃক কাটা টিডিএস (TDS)-এর তথ্যই অন্তর্ভুক্ত থাকে। এর বাইরে অন্যান্য একাধিক উৎস থেকে আসা আয়ের তথ্য এতে থাকে না, তাই কেবল এর ওপর নির্ভর করা ভুল।

৯. বিদেশে কোনো সম্পত্তি বা সম্পদ (Foreign Assets) থাকলে তা ঘোষণা করা:
আপনি যদি একজন ভারতীয় কর আবাসিক (Tax Resident) হন এবং আপনার নামে বিদেশে কোনো ধরনের সম্পদ বা অ্যাকাউন্ট থাকে, তবে তা অবশ্যই আইটিআর-এ ঘোষণা করতে হবে। তথ্য গোপন করলে ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত চটজলদি জরিমানা এবং বিশেষ ক্ষেত্রে কঠোর ‘ব্ল্যাক মানি অ্যাক্ট’ (Black Money Act)-এর আওতায় আইনি ব্যবস্থার মুখে পড়তে হতে পারে।

সবশেষে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আইটিআর জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া শেষ করার পর অবশ্যই এর ই-ভেরিফিকেশন (e-Verification) সম্পূর্ণ করুন। ই-ভেরিফিকেশন না করলে আপনার দাখিল করা রিটার্নটি আইনগতভাবে বৈধ বলে গণ্য হবে না। সে ক্ষেত্রে তা জমা না দেওয়া হয়েছে বলেই ধরা হবে এবং আপনি দেরির ফি, রিফান্ডে সুদের আর্থিক ক্ষতি বা আয়কর দফতরের নোটিসের মতো জটিল সমস্যার জালে জড়িয়ে পড়তে পারেন।

যাঁরা এখনও চলতি মূল্যায়ন বর্ষের আইটিআর জমা দেননি, তাঁদের উদ্দেশ্যে অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের একটাই পরামর্শ—আগামী ৩১ জুলাইয়ের আগেই সমস্ত প্রয়োজনীয় তথ্য ঠান্ডা মাথায় যাচাই করে সঠিকভাবে রিটার্ন দাখিল করুন, যাতে ভবিষ্যতে কোনো রকম আইনি বা আর্থিক জটিলতার মুখোমুখি হতে না হয়।