ভিআইপি সংস্কৃতির দিন শেষ তারাপীঠে! অমাবস্যার আগে কোন নতুন নিয়ম চালু করল মন্দির কমিটি?

তারাপীঠের হোটেল অগ্নিকাণ্ডে ৯ পূণ্যার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যুর পর থেকেই কড়া পদক্ষেপ করতে শুরু করেছে প্রশাসন ও মন্দির কমিটি। সম্প্রতি নিরাপত্তার কারণে তারাপীঠের ১৫টি হোটেল অবিলম্বে বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। আর এর মধ্যেই সামনে এল বছরের অন্যতম বড় ধর্মীয় উৎসব কৌশিকী অমাবস্যা। এই বিশেষ তিথিতে তারাপীঠে পুণ্যার্থীদের বাঁধভাঙা ভিড় সামলাতে এবং চরম শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবার একেবারে বেনজির ও কঠোর সিদ্ধান্ত নিল তারাপীঠ মন্দির কমিটি।
আসন্ন কৌশিকী অমাবস্যায় তারাপীঠ মন্দিরে আর আগের মতো সহজে গর্ভগৃহে ঢোকার সুযোগ মিলবে না। রামপুরহাটের রক্তকরবী মঞ্চে জেলা প্রশাসন, মন্দির কমিটি, হোটেল মালিক এবং বিভিন্ন দপ্তরের আধিকারিকদের নিয়ে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক বৈঠকের পরই এই সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছে।
গর্ভগৃহে সর্বসাধারণের প্রবেশ নিষেধ
কৌশিকী অমাবস্যার দিন তারাপীঠ মন্দিরে রেকর্ড পরিমাণ ভক্তের সমাগম হয়। বিগত বছরগুলিতে দেখা গেছে, সাধারণ মানুষ দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে কষ্ট করে দর্শন করলেও প্রভাবশালী মন্ত্রী, নেতা বা আমলারা ভিড় এড়িয়ে সহজেই গর্ভগৃহে ঢুকে পড়তেন। তবে এবার সেই ‘ভিআইপি সংস্কৃতি’র পুরোপুরি অবসান ঘটতে চলেছে। মন্দির কমিটির সভাপতি নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, আগামী ১০ সেপ্টেম্বর কৌশিকী অমাবস্যার দিন সাধারণ পুণ্যার্থী থেকে শুরু করে কোনো মন্ত্রী, বিধায়ক, সাংসদ বা আমলা— কাউকেই গর্ভগৃহে প্রবেশ করার অনুমতি দেওয়া হবে না। সকলের জন্যই একই নিয়ম কঠোরভাবে বলবৎ থাকবে।
দূর থেকেই দর্শন ও চরণস্পর্শের ব্যবস্থা
গর্ভগৃহের ভেতরে প্রবেশ নিষেধ থাকলেও ভক্তদের আবেগের দিকটি মাথায় রেখে বিশেষ ব্যবস্থা করেছে মন্দির কর্তৃপক্ষ। গর্ভগৃহের বাইরে অর্থাৎ নাটমন্দিরের বারান্দা থেকেই অন্তত ৫ ফুট দূরত্ব বজায় রেখে মা তারা-র প্রতিমা দর্শন করতে হবে। তবে ভক্তরা যাতে পুজো দিতে পারেন, তার জন্য মায়ের বিশেষ ধাতব চরণযুগল গর্ভগৃহের ঠিক বাইরে বারান্দায় রাখা থাকবে। সেখানেই ভক্তরা সশরীরে উপস্থিত থেকে চরণস্পর্শ করার সুযোগ পাবেন।
পে লাইন ও অন্যান্য নতুন নিয়মাবলী
এবারের কৌশিকী অমাবস্যায় ভিড় নিয়ন্ত্রণে একাধিক লাইন বা সারির ব্যবস্থা করা হয়েছে:
সাধারণ লাইন: সাধারণ পুণ্যার্থীদের মন্দিরে প্রবেশের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে লাইনে দাঁড়িয়ে পুজো দেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে।
বিশেষ পে লাইন: মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণ এবং সুশৃঙ্খল পরিচালনার কথা মাথায় রেখে একটি বিশেষ পে লাইন বা ভিআইপি লাইন চালু করা হয়েছে, যার সর্বোচ্চ মূল্য ধার্য করা হয়েছে মাথাপিছু ৫০০ টাকা।
স্থানীয়দের সুবিধা: এলাকার সাধারণ মানুষেরা যাতে কোনো রকম হয়রানির শিকার না হন, তার জন্য ৫০০ টাকার এই বিশেষ লাইনে স্থানীয় বাসিন্দাদের বিনামূল্যে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে।
পাশাপাশি, কোনো প্রশাসনিক আধিকারিক বা প্রভাবশালী ব্যক্তি যাতে গর্ভগৃহের জন্য বাড়তি সুবিধার অনুরোধ না করেন, সে বিষয়েও বৈঠকে বিশেষ আর্জি জানিয়েছেন মন্দির কমিটির সভাপতি।
উল্লেখ্য, আগামী ১০ সেপ্টেম্বর (পঞ্জিকা মতে, সকাল ১০টা ১১ মিনিট থেকে শুরু হয়ে ১১ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত) কৌশিকী অমাবস্যার পুণ্যতিথি রয়েছে। তবে তিথির আগের দিন থেকেই তারাপীঠ জুড়ে নামে ভক্তদের ঢল। হোটেল অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার শিক্ষা নিয়ে তাই এবার ভিড় নিয়ন্ত্রণ, অগ্নিনিরাপত্তা, যানবাহন চলাচল এবং সার্বিক সুরক্ষায় বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে নারাজ প্রশাসন ও মন্দির কমিটি। নতুন এই কড়া নিয়ম ভক্তরা কতটা সহজে মেনে চলেন, এখন সেটাই দেখার বিষয়।