ভারতের প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় নতুন মাইলফলক, আকাশ থেকে সমুদ্র, সব যন্ত্রাংশ এবার ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’

প্রতিরক্ষা খাতে আত্মনির্ভরতার পথে আরও এক বড় পদক্ষেপ নিল ভারত। বিদেশি সরঞ্জামের ওপর নির্ভরতা পুরোপুরি কমিয়ে আনতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্প্রতি ৪০৫টি প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের একটি ষষ্ঠ তালিকা প্রকাশ করেছে। এখন থেকে এই সরঞ্জাম, খুচরা যন্ত্রাংশ এবং সাব-সিস্টেমগুলো বিদেশ থেকে আমদানি না করে সম্পূর্ণরূপে ভারতের মাটিতে তৈরি করা হবে। সরকারের এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত কেবল সশস্ত্র বাহিনীকে উন্নত প্রযুক্তিই দেবে না, বরং ভারতীয় অর্থনীতি ও শিল্প খাতে এক বিশাল গতির সঞ্চার করবে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই তালিকায় ছোট-বড় মিলিয়ে ৪০৫টি গুরুত্বপূর্ণ সামগ্রী অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি সামগ্রী সরাসরি ভারতীয় উপকূলরক্ষী বাহিনীর (Indian Coast Guard) প্রয়োজনে ব্যবহৃত হবে, আর বাকি ৩৮৯টি সামগ্রী প্রতিরক্ষা সরকারি খাতের সংস্থা বা ডিপিএসইউ-এর জন্য নির্ধারিত। এই তালিকার পরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত। এতে অ্যাডভান্সড লাইট হেলিকপ্টার (ALH), লাইট ইউটিলিটি হেলিকপ্টার, সুখোই-৩০ এমকেআই ফাইটার জেট, লাইট কমব্যাট এয়ারক্রাফট এবং এএল-৩১এফপি ইঞ্জিনের অত্যন্ত জটিল যন্ত্রাংশগুলোও রয়েছে। শুধু আকাশপথেই নয়, স্থল ও নৌ-প্রতিরক্ষাতেও আমূল পরিবর্তন আসছে। টি-৭২ এবং টি-৯০ ট্যাঙ্কের খুচরা যন্ত্রাংশ, যুদ্ধজাহাজ, রাডার, ফায়ার কন্ট্রোল সিস্টেম, স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন এবং কনকোর্স-এম বা এমআরএসএএম-এর মতো শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র ও ট্যাঙ্ক-বিধ্বংসী গোলাবারুদ এখন দেশেই উৎপাদিত হবে।
এই প্রকল্পের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো এমএসএমই বা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলোর অংশগ্রহণ। সরকার ‘সৃজন’ প্রতিরক্ষা পোর্টালে এই ৪০৫টি সরঞ্জামের তালিকা এবং সেগুলোর উৎপাদন সময়সীমা বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করেছে। এখন থেকে দেশীয় কোম্পানিগুলো এই তালিকা অনুযায়ী পণ্য উৎপাদনের বড় বড় সরকারি চুক্তি পাওয়ার সুযোগ পাবে। এটি শুধু কর্মসংস্থানের নতুন দুয়ার উন্মোচন করবে না, বরং ভারতের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করতেও সাহায্য করবে।
‘আত্মনির্ভর ভারত’ উদ্যোগের অধীনে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ২০২০ সালের আগস্টে ‘সৃজন’ পোর্টাল চালু করেছিল। ২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত এই পোর্টালের মাধ্যমে ৩৩,০০০-এরও বেশি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম দেশীয় শিল্পকে উৎপাদনের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে। গত পাঁচ বছরে ভারত এ ধরনের পাঁচটি তালিকা প্রকাশ করেছে, যা প্রতিরক্ষা খাতে আমদানির নির্ভরতা কমিয়ে এনেছে। পরিসংখ্যান বলছে, দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে গত পাঁচ বছরে ভারত আমদানিতে প্রায় ৯,০০০ কোটি টাকা সাশ্রয় করেছে। শুধু তাই নয়, ২০২৬ সালের মার্চ মাসের মধ্যে রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলো দেশীয় সরবরাহকারীদের কাছে প্রায় ১০,০০০ কোটি টাকার উৎপাদন আদেশ প্রদান করেছে, যা ভারতের অর্থনীতির ভিতকে আরও শক্তিশালী করছে। ভারতের প্রতিরক্ষা খাতে এই নিরন্তর আত্মনির্ভরশীলতার সফর কেবল একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত নয়, এটি একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন অর্থনীতির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।