পাতলা হলেই কি সুস্থ? স্লিম ফিগারেও লুকিয়ে রয়েছে ভয়াবহ হৃদরোগের ঝুঁকি!

সাধারণত মানুষের মধ্যে একটি দীর্ঘদিনের ভুল ধারণা রয়েছে যে, উচ্চ কোলেস্টেরলের সমস্যা কেবল স্থূলকায় বা অতিরিক্ত ওজনের মানুষদেরই হয়ে থাকে। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন সম্পূর্ণ অন্য কথা। একজন পাতলা বা স্লিম গড়নের মানুষও সমানভাবে উচ্চ কোলেস্টেরলের শিকার হতে পারেন। দিল্লির শ্রী বালাজি অ্যাকশন মেডিকেল ইনস্টিটিউটের কার্ডিওলজি বিভাগের পরিচালক ডঃ অমর সিংঘল জানান, কোলেস্টেরলের মাত্রা কেবল শরীরের ওজনের ওপর নির্ভর করে না, বরং এটি জিনগত কারণ, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার সাথে গভীরভাবে জড়িত। তাই পাতলা মানুষদেরও নিয়মিত লিপিড প্রোফাইল পরীক্ষা করানো অত্যন্ত জরুরি।
প্রকৃতপক্ষে, কোলেস্টেরল হলো শরীরের একটি প্রয়োজনীয় চর্বিসদৃশ পদার্থ, যা কোষ গঠন এবং হরমোন উৎপাদনে সাহায্য করে। তবে সমস্যা তৈরি হয় যখন শরীরে ‘খারাপ কোলেস্টেরল’ বা এলডিএল-এর পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে ধমনীতে এলডিএল জমতে থাকলে রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়, যা পরবর্তীতে মারাত্মক হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
পাতলা গড়নের মানুষদের মধ্যেও খারাপ কোলেস্টেরল বৃদ্ধির পেছনে বেশ কিছু নির্দিষ্ট কারণ কাজ করে। প্রথমত, বংশগত বা জিনগত কারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনেকের পরিবারে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত ‘ফ্যামিলিয়াল হাইপারকোলেস্টেরোলেমিয়া’ নামক জিনগত অবস্থা থাকে, যার কারণে তাদের ওজন কম হলেও কোলেস্টেরলের মাত্রা অনেক বেশি হতে পারে। পরিবারে অল্প বয়সে হার্ট অ্যাটাকের ইতিহাস থাকলে এ বিষয়ে বাড়তি সতর্কতা নেওয়া উচিত। দ্বিতীয়ত, স্লিম হওয়ার অর্থ এই নয় যে আপনার ডায়েট বা খাদ্যাভ্যাস স্বাস্থ্যকর। প্রতিদিনের খাবারে অতিরিক্ত ভাজাভুজি, ট্রান্স ফ্যাট, স্যাচুরেটেড ফ্যাট, ফাস্টফুড এবং মিষ্টি জাতীয় খাবার থাকলে তা রক্তে কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এছাড়াও শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, ধূমপান এবং অতিরিক্ত মানসিক চাপ হৃদযন্ত্রের ক্ষতি করে।
চিকিৎসকদের মতে, উচ্চ কোলেস্টেরলকে একটি ‘নীরব ঘাতক’ বা সাইলেন্ট কিলার বলা হয়, কারণ প্রাথমিক অবস্থায় এর কোনো স্পষ্ট উপসর্গ বা লক্ষণ প্রকাশ পায় না। একজন মানুষ বাহ্যিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ ও ফিট মনে হলেও তার রক্তে কোলেস্টেরল বিপজ্জনক স্তরে থাকতে পারে। তাই শুধুমাত্র শারীরিক গঠন বা ওজনের ওপর ভরসা করে স্বাস্থ্যের মূল্যায়ন করা বোকামি।
এই বিপদ থেকে বাঁচতে বিশেষজ্ঞরা কিছু সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দিয়েছেন। প্রতিদিন সুষম ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়া, নিয়মিত শরীরচর্চা করা, ধূমপান বর্জন করা এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর লিপিড প্রোফাইল টেস্ট করানো অত্যন্ত আবশ্যক। যদি পরীক্ষার রিপোর্টে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি পাওয়া যায়, তবে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। অনেক ক্ষেত্রে শুধু জীবনযাত্রার মান পরিবর্তন করলেই কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে চলে আসে, আবার বংশগত বা উচ্চ ঝুঁকির ক্ষেত্রে ওষুধেরও প্রয়োজন হতে পারে। তাই মনে রাখবেন, পাতলা গড়ন মানেই সুস্বাস্থ্যের নিশ্চয়তা নয়। একটি সুস্থ ও সবল হৃদপিণ্ড পেতে হলে ওজন ছাড়াও শরীরের ভেতরের অন্যান্য স্বাস্থ্য প্যারামিটারগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা সমানভাবে জরুরি।