‘ভবিষ্যত্ শেষ হয়ে যাবে,’ ২৫২টি মাদ্রাসা বন্ধের ফরমান, ভেবে দেখার দাবি ফুরফুরার ত্বহার

রাজ্যজুড়ে অনুমোদনহীন ও অনিয়মে ভরপুর মাদ্রাসার বিরুদ্ধে নজিরবিহীন নড়াচড়া শুরু করল রাজ্য সরকার। সাম্প্রতিক এক দফায় তদন্ত ও পর্যালোচনার পর প্রথম পর্যায়েই রাজ্যের ২৫২টি মাদ্রাসা একযোগে বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে গুরুতর অনিয়ম ও অসংগতি মেলায় আরও ১০০টি মাদ্রাসাকে শোকজ বা কারণ দর্শানোর নোটিস পাঠিয়েছে সংখ্যালঘু ও মাদ্রাসা শিক্ষা দফতর।
রাজ্যের নির্দেশে আগেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, জেলায় জেলায় অনুমোদনপ্রাপ্ত ও অনুমোদনহীন মাদ্রাসার তালিকা তৈরি করে সেগুলির পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা চালানো হবে। সেই নির্দেশমতো কলকাতার পাশাপাশি রাজ্যের ২২টি জেলাতেই এই সমীক্ষা চালায় প্রশাসন।
কেন এই চরম সিদ্ধান্ত?
তদন্তে নেমে জেলা প্রশাসন মূলত কতগুলি নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর নজর দিয়েছিল:
মাদ্রাসার নিজস্ব পরিচালন ব্যবস্থা ও পরিচালনা সমিতি।
শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রকৃত সংখ্যা ও পড়ুয়াদের দৈনিক উপস্থিতি।
পরিকাঠামো এবং অর্থ জোগানের মূল উৎস।
যে ২৫২টি মাদ্রাসা বন্ধের নির্দেশ জারি করা হয়েছে, তার মধ্যে সিংহভাগই ‘খারিজি’ বা অনুমোদনহীন মাদ্রাসা। এই সংক্রান্ত যাবতীয় নির্দেশিকা ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট জেলাশাসকদের কাছে লিখিতভাবে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, যে ১০০টি মাদ্রাসাকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়েছে, তাদের প্রমাণ করতে হবে যে পঠনপাঠন চালিয়ে যাওয়ার মতো ন্যূনতম পরিকাঠামো তাদের রয়েছে। উপযুক্ত প্রমাণ পেশ করতে ব্যর্থ হলে সেই মাদ্রাসাগুলির বিরুদ্ধেও কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে চলেছে রাজ্য সরকার।
রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া
রাজ্যের এই পদক্ষেপ প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই তোলপাড় শুরু হয়েছে রাজ্য রাজনীতিতে।
কালীঘাটের তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে জানান, “মাদ্রাসা একটি শিক্ষার বিশেষ ঘরানা। আমাদের দেশে টোল শিক্ষা বা অন্যান্য নানান ধর্মীয় ও প্রথাগত শিক্ষার পদ্ধতি আছে। তাই গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাকে শুধুমাত্র ধর্মীয় শিক্ষার ভিত্তিতে দাগিয়ে দেওয়া বোধহয় যুক্তিসংগত নয়।”
“সরকারের উচিত ছিল অনুমোদন দেওয়া, বন্ধ করা নয়”: তোপ ত্বহা সিদ্দিকীর
অন্য দিকে, নবান্নের এই সিদ্ধান্তে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ফুরফুরা শরীফের পীরজাদা ত্বহা সিদ্দিকী। তিনি কড়া সুর চড়িয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, “কোন তথ্য বা কিসের ভিত্তিতে এই ২৫২টি মাদ্রাসা বন্ধ করে দেওয়া হলো, তা বাংলার মানুষ এখনো জানে না। ১০০টিকে শোকজ করা হলো। যদি প্রতিটি মাদ্রাসায় ৫০ জন করেও ছাত্রছাত্রী থাকে, তবে তাদের ভবিষ্যৎ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?”
তিনি আরও বলেন, “অধিকাংশ মাদ্রাসাতেই ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি সাধারণ সরকারি সিলেবাস অনুযায়ী পড়াশোনা করানো হয়। ধর্মীয় শিক্ষা মানুষকে একে অপরকে ভালোবাসতে শেখায়, দেশের প্রতি ভালোবাসা গড়ে তোলে। যে মাদ্রাসাগুলির সরকারি অনুমোদন নেই, সরকারের দায়িত্ব ছিল সেগুলিকে অনুমোদন দিয়ে সুন্দরভাবে পরিচালনা করা। তা না করে এভাবে মাদ্রাসা বন্ধ করে দেওয়া অন্যায় ও জুলুম। এতে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
সব মিলিয়ে, সরকার ও প্রশাসনিক স্তরে অনিয়ম রুখতে কড়া আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হলেও, সিদ্ধান্তটি ঘিরে বর্তমানে উত্তপ্ত বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ।