পুজোয় কি তবে বন্ধ পদ্মার ইলিশ? বাংলাদেশে ইলিশের ঘাটতি, বড় আশায় ব্যবসায়ীরা

দুর্গাপুজো মানেই বাঙালি উৎসবের মেজাজে ভাসবে আর পাতের এক কোণে শোভা পাবে পদ্মার টাটকা ইলিশ। প্রতিবছর এই সময়ে এপারের বাঙালিরা অধীর আগ্রহে তাকিয়ে থাকে ওপার বাংলা থেকে আসা ইলিশের রূপোলি ঝিলিকের দিকে। কিন্তু ২০২৬ সালের চিত্রপট একদম উল্টো! এবার পদ্মার ইলিশ ভারতে আসার আগেই হাওড়া হয়ে গুজরাতের ইলিশ ঢুকে পড়ছে বাংলাদেশের বাজারে।

বিভিন্ন বাণিজ্যিক রিপোর্ট অনুযায়ী, গত দুই মাসে গুজরাত থেকে হাওড়ার পাইকারি বাজার হয়ে প্রায় ৫০০ মেট্রিক টন ইলিশ পাঠানো হয়েছে বাংলাদেশে। পুজোর ঠিক মুখেই আরও প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ টন ইলিশ রফতানির বড় অর্ডার রয়েছে ভারতের হাতে। প্রতি কেজি মাত্র ৬০০ টাকা দরে এই মাছ বাংলাদেশ কেনায় ব্যবসায়ীদের মধ্যেও শুরু হয়েছে ব্যাপক চর্চা।

বাংলাদেশে ইলিশের ঘাটতি, ভরসা ভারতের গুজরাত

বাংলাদেশের পদ্মা, মেঘনা ও উপকূলীয় অঞ্চলে দীর্ঘকাল ধরে বিপুল পরিমাণ ইলিশ পাওয়া গেলেও চলতি মরশুমে চিত্রটা বেশ ভিন্ন। স্থানীয় বাজারে ইলিশের জোগান এক ধাক্কায় অনেকটাই কমে গেছে। দেশীয় চাহিদা মেটাতে বাধ্য হয়েই ভারতের শরণাপন্ন হয়েছেন ওপার বাংলার আমদানিকারকরা।

হাওড়ার পাইকারি মাছ বাজারের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, এর আগে কখনও এত বড় পরিমাণে ভারতের ইলিশ বাংলাদেশে পাঠানো হয়নি। এতদিন যেখানে ইলিশ রফতানিতে বাংলাদেশের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল, সেখানে এবার নিজেদের ঘাটতি মেটাতে তারা ভারত থেকে মাছ কিনছে।

কেন হঠাৎ এত চাহিদা গুজরাতের ইলিশের?

প্রশ্ন উঠছে, ভারতের নানা রাজ্যের ইলিশ ছেড়ে গুজরাতের ইলিশের ওপর কেন ঝুঁকলেন বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা?

  • ডিমওয়ালা মাছের জোগান: গুজরাতের নর্মদা নদীর মোহনা ও আরব সাগর সংলগ্ন এলাকা থেকে পাওয়া ইলিশে ডিমের পরিমাণ বেশি থাকে।

  • চট্টগ্রাম ও সিলেটের বিশেষ পছন্দ: বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলের বাজারে ডিমওয়ালা ইলিশ এবং ইলিশের ডিম আলাদাভাবে বিক্রি করার বিশেষ চাহিদা রয়েছে।

  • নোনা মাছের ব্যবহার: এই মাছের এক বিশাল অংশ প্রক্রিয়াজাত করে বা শুকিয়ে (নোনা ইলিশ হিসেবে) বাংলাদেশে বাজারজাত করা হচ্ছে।

তবে কি পুজোয় মিলবে না পদ্মার রূপোলি ফসল?

গুজরাতের ইলিশ রফতানি হলেও পুজোয় পদ্মার ইলিশ ভারতে আসবে না—এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। কলকাতার মাছ আমদানিকারকদের একটি প্রতিনিধি দল ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রীর কাছে চিঠি দিয়ে দুর্গাপুজোর আগে ইলিশ রফতানির বিশেষ অনুমতি চেয়েছেন।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের ১৮টি রফতানিকারক সংস্থাও ভারতে মাছ পাঠানোর অনুমোদন চেয়েছে। অতীতে যেমন ২০২৫ সালেও বাংলাদেশ সরকার দুর্গাপুজোর প্রাক্কালে ১,২০০ টন ইলিশ রফতানির অনুমতি দিয়েছিল (প্রতি কেজি সর্বনিম্ন ১২.৫০ মার্কিন ডলার মূল্যে), এবারও শেষ মুহূর্তে বাংলাদেশ সরকার সায় দিলে সীমিত পরিমাণে হলেও পদ্মার ইলিশ আসবে পশ্চিমবঙ্গের বাজারে।

বিষয়ভারতের ইলিশ (গুজরাত)বাংলাদেশের ইলিশ (পদ্মা-মেঘনা)
বর্তমান প্রবাহহাওড়া হয়ে প্রতিদিন রফতানি হচ্ছে বাংলাদেশেসরকারের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায়
রফতানির পরিমাণইতিমধ্যে ৫০০ টন পাঠানো হয়েছেআবেদন জানানো হয়েছে ১২০০+ টনের জন্য
প্রধান বৈশিষ্ট্যসুস্বাদু ডিম ও নোনা মাছ বানানোর উপযোগিতাঅতুলনীয় স্বাদ, গন্ধ ও উৎসবের আবেগ

একই সময়ে দুই দেশের সীমান্তে ইলিশের এই দ্বি-পাক্ষিক বাণিজ্য নতুন এক অর্থনৈতিক সমীকরণ তৈরি করেছে। একদিকে ওপার বাংলার ঘাটতি মেটাচ্ছে গুজরাতের মাছ, আর অন্যদিকে পুজোর স্বাদের খাঁটি আমেজ বজায় রাখতে পদ্মার অনুমোদনের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে কলকাতার বাজার।