ভগত সিংয়ের শিক্ষককে মনে রাখল দেশ! পাতিয়ালা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বিশেষ পদক্ষেপে কোন বড় ইতিহাস এল সামনে?

ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসে যখনই শহীদ ভগৎ সিং-এর নাম উচ্চারিত হয়, তখন প্রায়শই তাঁর বিপ্লবী সহযোদ্ধা, বীরত্বপূর্ণ অবদান এবং ত্যাগের কথা ফলাও করে আলোচনা করা হয়। কিন্তু খুব কম মানুষই হয়তো জানেন যে, খ্যাতনামা শিক্ষক অধ্যক্ষ ছবিল দাস ছিলেন সেই দূরদর্শী ব্যক্তিত্বদের মধ্যে একজন, যাঁরা ভগত সিংয়ের সুকঠিন চরিত্র, রাজনৈতিক দর্শন এবং বিপ্লবী আদর্শ গঠনে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছিলেন। তরুণ বয়সে ভগত সিংয়ের মনে দেশপ্রেমের বীজ বপনকারী এই কিংবদন্তি শিক্ষকের অবদানকে যথাযথ সম্মান ও শ্রদ্ধা জানাতে এবার পঞ্জাবের পাতিয়ালার মর্যাদাপূর্ণ পাঞ্জাবি বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর স্মৃতিতে বিশেষ “অধ্যক্ষ ছবিল দাস স্মৃতি পুরস্কার” প্রবর্তন করেছে।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায় যে, ১৯২৩ সালে তরুণ ভগৎ সিং উচ্চশিক্ষার জন্য লাহোরের ন্যাশনাল কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। ব্রিটিশদের প্রণীত পরাধীনতার শিক্ষাব্যবস্থা বর্জনকারী দেশপ্রেমিক ছাত্রদের জন্য প্রখ্যাত জাতীয়তাবাদী নেতা লালা লাজপত রায় অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে এই কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই সময় অধ্যক্ষ ছবিল দাস ওই কলেজের অধ্যক্ষের পাশাপাশি ইংরেজির স্বনামধন্য অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ছবিল দাসই প্রথম তরুণ ভগত সিংকে বিশ্ব ইতিহাস, সমকালীন রাজনীতি, মার্ক্সবাদী সমাজতন্ত্র এবং স্বাধীন ভারতের স্বাধিকার আন্দোলনের বিভিন্ন ধারণার সঙ্গে গভীরভাবে পরিচয় করিয়ে দেন। তাঁর প্রখর বুদ্ধিমত্তা ও দূরদর্শী নির্দেশনা ভগত সিংয়ের রাজনৈতিক চিন্তাধারাকে আমূল রূপ দিয়েছিল। ঐতিহাসিকদের মতে, ওই কলেজের মুক্ত বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ এবং ছবিল দাসের মতো প্রথিতযশা শিক্ষকদের সুগভীর প্রভাবই ভগত সিংকে একজন আপসহীন বিপ্লবী হিসেবে গড়ে ওঠার অন্তরালে প্রধান অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।
অধ্যক্ষ ছবিল দাস ব্যক্তিগত জীবনেও সমাজতান্ত্রিক ধারণার একনিষ্ঠ ও দৃঢ় সমর্থক ছিলেন। তিনি কেবল ক্লাসরুমের পাঠদানেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বরং সমাজ পরিবর্তনে কলমকেও অস্ত্র করেছিলেন। তিনি উর্দু ভাষায় অসংখ্য প্রবন্ধ, গবেষণামূলক নিবন্ধ ও বই রচনা করেছিলেন। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত ও প্রভাবশালী রচনাগুলির মধ্যে একটি হলো “সমাজতন্ত্র কেন”, যেখানে তিনি সমাজের সর্বস্তরে সামাজিক সমতা, শ্রেণিহীন সমাজ গঠন এবং অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের আবশ্যিক প্রয়োজনীয়তার ওপর জোরালো জোর দিয়েছিলেন। তাঁর লেখার মূল উদ্দেশ্য ছিল ছাত্রসমাজকে গতানুগতিক শিক্ষার গণ্ডি থেকে মুক্ত করে যুবকদের মনে গভীর সামাজিক চেতনা, রাজনৈতিক সচেতনতা এবং অদম্য দেশপ্রেম জাগিয়ে তোলা। শুধু তাই নয়, তাঁর পুরো পরিবারটিই প্রত্যক্ষভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। ছবিল দাসের সুযোগ্য সহধর্মিণী সীতা দেবীও একজন নিবেদিতপ্রাণ স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন। তিনি তৎকালীন শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন এবং পরবর্তীতে সংসদ সদস্য হিসেবেও দেশসেবা করেন। দেশভাগের দুঃসহ ঘটনার পর এই বিপ্লবী পরিবারটি পঞ্জাবের জলন্ধরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। স্বাধীনতার সূর্য ওঠার বহু পরেও তাঁরা দুজনেই দেশের প্রান্তিক মানুষের সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কাজে নিজেদের সঁপে দিয়েছিলেন।
এই মহান শিক্ষকের অবদানের কথা চিরস্মরণীয় করে রাখতে পাঞ্জাবি বিশ্ববিদ্যালয় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারটি প্রতি বছর ২৩শে মার্চ, শহীদ ভগৎ সিং-এর অমর শহিদ দিবসে পাতিয়ালার পাঞ্জাবি বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রদান করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের যে সমস্ত তরুণ গবেষক ও ছাত্রছাত্রী ভগৎ সিং, তাঁর বীর বিপ্লবী সহযোদ্ধা কিংবা ভারতের সামগ্রিক স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস নিয়ে পাঞ্জাবি ভাষায় কোনো উচ্চমানের গবেষণাপত্র, গ্রন্থ বা প্রবন্ধ রচনা, উপস্থাপন কিংবা প্রকাশ করবেন, তাঁদেরই এই বিশেষ পুরস্কারের জন্য নির্বাচন করা হবে। এই পুরস্কারের অংশ হিসেবে বিজয়ী গবেষককে আর্থিক সম্মান হিসেবে নগদ ৫,০০০ টাকা এবং একটি সুদৃশ্য মানপত্র বা সম্মাননাপত্র প্রদান করা হবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এই বিশেষ পুরস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক তহবিল বা অনুদান প্রদান করেছেন খোদ অধ্যক্ষ ছবিল দাসের নাতনি সাবা দেওয়ান। সাবা দেওয়ান হলেন দেশের একজন অত্যন্ত সুপরিচিত ইংরেজি লেখিকা ও স্বনামধন্য তথ্যচিত্র নির্মাতা। পাঞ্জাবি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তাঁর পরিবারের এই দীর্ঘদিনের নাড়ির টান ও পারিবারিক ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে কাঁধে তুলে নিয়েছেন।