বাবার রাজনৈতিক পরিচয়ের খেসারত! দীর্ঘ ৯ বছর কালনার সুইমিং পুলে ব্রাত্য থাকার পর অবশেষে বড় মোড়

সমুদ্রে একের পর এক ইতিহাস গড়ে আন্তর্জাতিক স্তরে বাংলার মুখ উজ্জ্বল করেছেন প্রখ্যাত সাঁতারু সায়নী দাস। ইতিমধ্যেই বিশ্বের ৬টি সুকঠিন চ্যানেল সফলভাবে পার করে তিনি জাতীয় পুরস্কারও অর্জন করেছেন। কিন্তু বিশ্বজয়ী এই ক্রীড়াবিদকেই এতদিন ধরে নিজের শহরের সুইমিং পুলে প্র্যাকটিস করার সামান্য সুযোগ দেওয়া হয়নি। দীর্ঘ প্রায় নয় বছর ধরে কালনা শহরের একমাত্র মিউনিসিপ্যাল সুইমিং পুলের দরজা তাঁর জন্য পুরোপুরি বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। আর এর নেপথ্যে যে কারণ উঠে এসেছে, তা জানলে যেকোনো ক্রীড়াপ্রেমীর মাথা লজ্জায় নুয়ে পড়বে। অভিযোগ উঠেছে, সায়নীর বাবা পেশায় একজন প্রাথমিক শিক্ষক এবং তিনি বামপন্থী তথা সিপিএম দলের সমর্থক হওয়ার অপরাধেই তৎকালীন শাসকদলের রোষানলে পড়তে হয়েছিল এই তরুণী সাঁতারুকে।
ঘটনার সূত্রপাত ২০১৫ সাল থেকে। সায়নীর বাবা সিপিএম সমর্থক হওয়ার কারণে তৎকালীন প্রভাবশালী তৃণমূল বিধায়ক দেবপ্রসাদ বাগ সায়নীকে কালনা শহরের ওই মিউনিসিপ্যাল সুইমিং পুলে ঢোকার উপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন। বিশ্বমঞ্চে দেশের ত্রিবর্ণরঞ্জিত পতাকা তুলে ধরার স্বপ্ন দেখা এক প্রতিভাবান ক্রীড়াবিদকে স্রেফ রাজনৈতিক সংকীর্ণতার জেরে ঘরের দরজায় ব্রাত্য থাকতে হয়েছিল। বাধ্য হয়েই নিজের শহরের নোংরা পুকুরের জলে প্র্যাকটিস চালিয়ে যেতে হতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই সাঁতারুকে। অতীতে সংবাদমাধ্যমের সামনে মুখ খুলে সায়নী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছিলেন যে, তিনি রাজনীতির ময়দানের কোনো নেত্রী নন, তিনি একজন অরাজনৈতিক ক্রীড়াবিদ। বাবা কে কোন দল করেন, তার জন্য একজন খেলোয়াড়কে কেন এমন অমানবিক বঞ্চনার শিকার হতে হবে, সেই প্রশ্ন তুলেছিলেন তিনি।
অবশেষে দীর্ঘ নয় বছরের দীর্ঘ লড়াই ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঘুরল ভাগ্যের চাকা। কালনার বর্তমান বিজেপি বিধায়ক সিদ্ধার্থ মজুমদার সায়নী দাসের ওপর চলা এই দীর্ঘ বঞ্চনা ও রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞার খবর পাওয়া মাত্রই সরাসরি তাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখা করেন। বৃহস্পতিবার সকালে তিনি সায়নীকে সসম্মানে কালনার সেই পুরোনো মিউনিসিপ্যাল সুইমিং পুলের সামনে ডেকে পাঠান। ক্যামেরার সামনে স্বয়ং বিধায়ক নিজ হাতে সুইমিং পুলের মূল গেটের তালা খুলে দেন এবং সায়নীকে আমন্ত্রণ জানান নির্ভয়ে ও সসম্মানে সেখানে ফের নিয়মিত অনুশীলন শুরু করার জন্য। বিধায়কের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন স্থানীয় ক্রীড়াপ্রেমীরা।
উল্লেখ্য, মাত্র ১৯ বছর বয়সে ইংলিশ চ্যানেল সফলভাবে সাঁতরে পার হয়ে আন্তর্জাতিক মহলে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন কালনার এই সাহসী মেয়ে। এরপর ২০১৯ সালে রোবেন আইল্যান্ড, ২০২২ সালে আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার ক্যাটালিনা চ্যানেল এবং ২০২৩ সালে বিশ্বের বিপজ্জনক মোলকাই চ্যানেল জয় করে ইতিহাস গড়েন তিনি। প্রবল স্রোত, প্রতিকূল হাঙরভর্তি জলরাশি এবং চরম আবহাওয়াকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মোলকাই চ্যানেল জয় করা প্রথম এশীয় নারী সাঁতারু হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন সায়নী। যদিও গত মাসে জাপানের সুগারু প্রণালী পার হওয়ার সময় বুকে ব্যথা অনুভব করায় তাঁর সাত নম্বর চ্যানেল জয়ের অভিযান সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়েছিল। তবে ঘরের মাঠে সুইমিং পুলের দরজা খুলে যাওয়ায় সায়নীর আগামী দিনের আন্তর্জাতিক লড়াইয়ে প্রস্তুতি এখন আরও অনেক বেশি শক্তিশালী হবে বলেই মনে করছেন ক্রীড়া বিশেষজ্ঞরা।