বাইক বাহিনীর তাণ্ডব নাকি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র? আদালতের নির্দেশ উড়িয়ে খোদ মমতার সামনেই সভাস্থলে ব্যাপক ভাঙচুর!

কলকাতা হাইকোর্টের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ মেনে একুশে জুলাইয়ের ঐতিহাসিক শহিদ দিবসের সভা যখন বিড়লা তারামণ্ডল চত্বরে হওয়ার কথা ছিল, ঠিক তার আগের রাতেই চরম রাজনৈতিক উত্তেজনায় কেঁপে উঠল তিলোত্তমা। সোমবার গভীর রাতে এক নাটকীয় ও তীব্র সংঘর্ষের আবহে রণক্ষেত্র হয়ে ওঠে গোটা চত্বর। অভিযোগ উঠেছে, আদালতের নির্দেশকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে গভীর রাতে সুসংগঠিত বাইক বাহিনী নিয়ে এসে তৃণমূলের নবনির্মিত সভাস্থলে ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়েছে দুষ্কৃতীরা। শুধু তাই নয়, সভাস্থলের চারপাশের ব্যানার-ফেস্টুন ছিঁড়ে ফেলা এবং বিদ্যুৎ সংযোগ ও মাইকের তার কেটে দেওয়ারও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই আকস্মিক ও ন্যক্কারজনক হামলার খবর পেয়েই আর কালক্ষেপ করেননি তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দোলা সেন ও কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে নিয়ে গভীর রাতেই তিনি সরাসরি ঘটনাস্থলে ছুটে যান।
ভাঙচুর হওয়া মঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে হাতে মাইক নিয়ে তীব্র ক্ষোভ উগরে দেন খোদ তৃণমূল সুপ্রিমো। তিনি সরাসরি বিজেপি এবং স্থানীয় প্রশাসনের দিকে আঙুল তুলে জানান, গভীর রাতে এক পরিচিত অপরাধীর নেতৃত্বে প্রায় ৬০-৭০ জনের একটি বাইক বাহিনী এসে সভাস্থলে অতর্কিত তাণ্ডব চালায় এবং সেখানে উপস্থিত ছাত্র-যুবদের ওপর চড়াও হয়। বৃষ্টির রাতে যারা প্যান্ডেল ও ডেকোরেটরের কাজ করছিলেন, তাঁদেরও ভয় দেখিয়ে জোরপূর্বক সরিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। এমনকি দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সাংসদ-আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপরেও হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেন মমতা। তাঁর অভিযোগ, এই সমস্ত ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং বিরোধী দলগুলোর গভীর চক্রান্ত।
তবে এই গোটা ঘটনায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমস্ত ক্ষোভের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল কলকাতা পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা। তিনি চরম বিস্ময় ও ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রশ্ন তোলেন যে, যেখানে কলকাতা হাইকোর্ট স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছিল সভাস্থলের সম্পূর্ণ আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব পুলিশের, সেখানে হামলার ঠিক আগে পুলিশ প্রশাসন কেন সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হয়ে সরে দাঁড়াল? পুলিশের এই অদ্ভুত ভূমিকা নিয়ে তীব্র আক্রমণ শানিয়ে মমতা বলেন, “হাইকোর্টের স্পষ্ট নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীরা কেন চোখের পলকে উধাও হয়ে গেল, তা আমার বোধগম্য হচ্ছে না।” পুলিশের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলে তিনি আরও জানান, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে একুশের সমাবেশে যোগ দিতে আসা সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের বিভিন্নভাবে বাধা দেওয়া হচ্ছে এবং অনেক জায়গায় পুলিশি হস্তক্ষেপে শহিদ পরিবারগুলোকেও হেনস্তা করা হচ্ছে।
এই পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা এবং আদালতের নির্দেশ লঙ্ঘনের দায়ে সরাসরি আইনি পদক্ষেপের পথে হাঁটার হুংকার দিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী। তিনি সাফ জানিয়ে দেন যে, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করার অপরাধে রাজ্য প্রশাসন ও পুলিশের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা দায়ের করা হবে। বিক্ষুব্ধ নেত্রীর স্পষ্ট কথা, “আমাদের কি তবে দলের সভা ও মঞ্চ পাহারা দেওয়ার জন্য সারা রাত রাস্তায় বসে থাকতে হবে?” দিল্লির রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা টেনে তিনি বিজেপিকে একহাত নেন এবং এই রাতের আক্রমণকে ‘মধ্যরাতের কালো ইতিহাস’ বলে আখ্যা দেন। একই সঙ্গে দেশের সমস্ত আঞ্চলিক দল ও গণতান্ত্রিক শক্তির প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতে জাতীয় স্তরের ‘ইন্ডিয়া’ জোটের শরিক দলগুলিরও এই স্বৈরাচারী মনোভাবের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে সোচ্চার হওয়া উচিত।