বাংলায় শুরু পিএম আবাস যোজনা! কীভাবে পাবেন পাকা বাড়ি? রইল খুঁটিনাটি

পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদলের পর সরকার গড়তেই কেন্দ্রের একাধিক জনকল্যাণমুখী প্রকল্প রাজ্যে দ্রুত কার্যকর করার তোড়জোড় শুরু করেছে বিজেপি প্রশাসন। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট করে দিয়েছেন, এতদিন বাংলায় যেসব কেন্দ্রীয় প্রকল্প থমকে ছিল বা নাম বদলে চালানো হচ্ছিল, সেগুলি এবার আসল নামে ও সরাসরি সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে চালু করা হবে। এই তালিকায় অন্যতম বড় এবং বহুল প্রতীক্ষিত প্রকল্প হলো ‘প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা’ (PMAY)।

আজকালকার দিনে আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধি এবং জমি-বাড়ির চড়া দামের কারণে নিজের একটা পাকা ছাদের স্বপ্ন মধ্যবিত্ত বা দরিদ্র পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে শহর ও গ্রামীণ এলাকার অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষদের এই স্বপ্ন সফল করতেই কেন্দ্রীয় সরকার এই প্রকল্প চালু করে। এই স্কিমের লক্ষ্য কেবল ঘর দেওয়া নয়, বরং সাধারণ মানুষকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করা। এই প্রকল্পের অধীনে গৃহ ঋণের সুদের ওপর বড় অঙ্কের ভর্তুকি পাওয়া যায়, যা মাসিক ইএমআই (EMI) অনেকটাই কমিয়ে দেয়। বাংলায় এই প্রকল্প নতুন করে গতি পাওয়ায় কীভাবে আবেদন করবেন এবং কারা এই সুবিধা পাবেন, তা বিস্তারিত জেনে নেওয়া জরুরি।

প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা আসলে কী?
২০১৫ সালে দেশজুড়ে সকলের জন্য আবাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই প্রকল্প চালু করে মোদী সরকার। বিশেষ করে গ্রামীণ ও শহরের কাঁচা বা জরাজীর্ণ বাড়িতে বসবাসকারী দরিদ্র পরিবারগুলিকে পাকা বাড়ি তৈরির জন্য সরাসরি আর্থিক সাহায্য দেওয়া হয় এই স্কিমে। নিয়ম অনুযায়ী, রান্নাঘরের জায়গাসহ কমপক্ষে ২৫ বর্গমিটারের একটি পাকা বাড়ি তৈরি করার টাকা সরাসরি উপভোক্তার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়। এই প্রকল্পটি মূলত দুটি ভাগে বিভক্ত— শহরে বসবাসকারীদের জন্য ‘PMAY-Urban’ এবং গ্রামের মানুষদের জন্য ‘PMAY-Gramin’।

সুবিধাভোগী কীভাবে নির্বাচন করা হয়?
আবাস যোজনার সুবিধা কারা পাবেন, তা অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে নির্ধারণ করা হয়। সরকার প্রথমে সামাজিক-অর্থনৈতিক জাতিগত জনগণনা (SECC)-র তথ্য যাচাই করে দরিদ্র ও প্রকৃত অভাবী পরিবারগুলিকে চিহ্নিত করে। এরপর সেই তালিকাটি স্থানীয় গ্রামসভায় পেশ করা হয়। সেখানে পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই-বাছাইয়ের পর চূড়ান্ত তালিকায় নাম উঠলেই আবেদনকারী এই সুবিধা পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হন।

আবেদনের যোগ্যতা কী কী?
এই প্রকল্পের সুবিধা পেতে গেলে আবেদনকারীর পারিবারিক বার্ষিক আয় নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে হতে হবে। আয়ের নিরিখে চারটি ভাগ রয়েছে:

EWS বিভাগ: বার্ষিক আয় ৩ লক্ষ টাকা পর্যন্ত।

LIG বিভাগ: বার্ষিক আয় ৩ থেকে ৬ লক্ষ টাকা।

MIG-1 বিভাগ: বার্ষিক আয় ৬ থেকে ১২ লক্ষ টাকা।

MIG-2 বিভাগ: বার্ষিক আয় ১২ থেকে ১৮ লক্ষ টাকা।

অন্যান্য জরুরি শর্ত:

আবেদনকারী বা তাঁর পরিবারের কোনও সদস্যের দেশের কোথাও কোনও পাকা বাড়ি থাকা চলবে না।

পরিবার বলতে স্বামী, স্ত্রী এবং অবিবাহিত সন্তানদের বোঝাবে।

আবেদনকারী আগে অন্য কোনও সরকারি আবাসন প্রকল্পের সুবিধা পেয়ে থাকলে এই স্কিমে আর ছাড় পাবেন না।

অনেক ক্ষেত্রে বাড়ির দলিলে বা রেজিস্ট্রেশনে পরিবারের অন্তত একজন মহিলা সদস্যের নাম থাকা বাধ্যতামূলক।

কীভাবে আবেদন করবেন?
প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার জন্য অনলাইন এবং অফলাইন— দুই পদ্ধতিতেই আবেদন করা সম্ভব।

অনলাইন পদ্ধতি: আবেদনকারীকে প্রথমে এই প্রকল্পের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে যেতে হবে। সেখানে ‘Citizen Assessment’ বিকল্পটি বেছে নিয়ে নিজের বিভাগ (Slum বা Other) সিলেক্ট করতে হবে। এরপর নির্দিষ্ট জায়গায় নাম, ঠিকানা, আয়ের উৎস এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের বিবরণ নির্ভুলভাবে পূরণ করতে হবে। প্রয়োজনীয় নথি আপলোড করে ফর্মটি জমা দেওয়ার পর একটি প্রিন্টআউট নিজের কাছে রেখে দিতে হবে।

অফলাইন পদ্ধতি: ইন্টারনেটের সুবিধা না থাকলে নিকটবর্তী কমন সার্ভিস সেন্টারে (CSC) গিয়ে মাত্র ২৫ টাকার বিনিময়ে ফর্ম সংগ্রহ করা যাবে। ফর্মটি সঠিকভাবে পূরণ করে প্রয়োজনীয় নথিপত্র সহ সেখানেই জমা দিলে আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।

সুদের হারে মিলবে কতটা ছাড়?
এই যোজনার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো হোম লোনের সুদের ওপর সরকারি ভর্তুকি, যা বাড়ির মালিক হওয়ার পথ সহজ করে দেয়। আয়ের ক্যাটাগরি অনুযায়ী এই ছাড় দেওয়া হয়:

EWS এবং LIG বিভাগ: ৬ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ঋণের ওপর ৬.৫ শতাংশ সুদের ভর্তুকি পাওয়া যায়।

MIG-1 বিভাগ: ৯ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ঋণের ওপর ৪ শতাংশ সুদের ছাড় মেলে।

MIG-2 বিভাগ: ১২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ঋণের ওপর ৩ শতাংশ সুদের সুরাহা পাওয়া যায়।

এই বিশেষ সুবিধাটি সর্বোচ্চ ২০ বছর মেয়াদের ঋণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সহজ কথায়, আপনি যদি MIG-1 বিভাগের অধীনে ৯ লক্ষ টাকা ঋণ নেন, তবে ৪ শতাংশ সুদের ভর্তুকির কারণে আপনার মাসিক ইএমআই উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। রাজ্যে নতুন সরকার আসার পর এই আবাসন প্রকল্প ঘিরে বাংলার সাধারণ মানুষের মনে নতুন করে আশার আলো দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy