সনাতন ধর্মে নিত্যপূজা থেকে শুরু করে যে কোনো উৎসব—ঈশ্বর আরাধনায় সুগন্ধির ব্যবহার আবহমানকাল ধরে চলে আসছে। আর এই সুগন্ধির কথা উঠলেই আমাদের মন ও মস্তিষ্কে দুটি নাম সবার আগে ভেসে ওঠে—ধূপকাঠি এবং ধুনো। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছেন, ঈশ্বরের বন্দনায় এই দুটির মধ্যে কোনটি বেশি গ্রহণযোগ্য? শাস্ত্র ও বিজ্ঞান বলছে, শুদ্ধতার বিচারে ধুনো সর্বদা ধূপকাঠির চেয়ে অনেক গুণ এগিয়ে।
সনাতন শাস্ত্র অনুযায়ী, ধুনো অত্যন্ত পবিত্র এবং দেব-দেবীকে নিবেদনের জন্য সর্বোত্তম উপাদান। ধুনো মূলত শাল গাছের প্রাকৃতিক নির্যাস থেকে তৈরি হয়, যা সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ। শাস্ত্রীয় মতে, ধুনোর সুগন্ধ চারপাশের নেতিবাচক শক্তি দূর করে এবং শুভ শক্তির আবাহন ঘটায়। বিশেষ করে মা দুর্গা, মহাদেব এবং মা লক্ষ্মীর পুজোর সময় ধুনোর ধোঁয়া ছাড়া যেন আরতি সম্পন্ন হয় না। আরতির সময় পঞ্চপ্রদীপের পাশাপাশি ধুনোর ধোঁয়া দেওয়ার প্রাচীন রীতি মূলত পরিবেশ ও মনকে দেব-আরাধনার উপযুক্ত করে তোলার জন্যই করা হয়ে থাকে।
বর্তমান ব্যস্ত জীবনে ধূপকাঠি জ্বালানো সুবিধাজনক হলেও, শাস্ত্রজ্ঞরা অধিকাংশ ধূপকাঠির ব্যবহারে আপত্তি জানান। এর মূল কারণ, বাজারচলতি অধিকাংশ ধূপকাঠিতে কাঠি হিসেবে বাঁশ ব্যবহার করা হয়। সনাতন ধর্মে বাঁশ পোড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, কারণ মনে করা হয় এতে বংশের ক্ষতি হয় এবং বাস্তুদোষ তৈরি হতে পারে। এছাড়া সস্তা ধূপকাঠিতে ব্যবহৃত কৃত্রিম রাসায়নিক সুগন্ধি পুজোর আধ্যাত্মিক বিশুদ্ধতা ক্ষুণ্ণ করে। তবে বর্তমানে বাঁশহীন ভেষজ ধূপকাঠি পাওয়া যায়, যা ব্যবহারে শাস্ত্রীয় বাধা নেই।
যেখানে ধুনো সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উৎস থেকে সংগৃহীত, সেখানে সাধারণ ধূপকাঠিতে কয়লার গুঁড়ো, কৃত্রিম আঠা ও কেমিক্যালের মিশ্রণ থাকে। শুধু শাস্ত্রই নয়, বিজ্ঞানও ধুনোর সপক্ষে। খাঁটি ধুনোর ধোঁয়া বাতাসে ভেসে থাকা ক্ষতিকারক জীবাণু ধ্বংস করতে এবং মশা-মাছি তাড়াতে অত্যন্ত কার্যকরী। এর সুগন্ধ মস্তিষ্কের ক্লান্তি দূর করে মনকে শান্ত ও একাগ্র করতে সাহায্য করে। বিপরীতক্রমে, রাসায়নিকযুক্ত ধূপকাঠির ধোঁয়া নিয়মিত ফুসফুসে প্রবেশ করলে তা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে বলে বিভিন্ন চিকিৎসা গবেষণায় প্রমাণিত।
শাস্ত্রের মূল কথা হলো, ঈশ্বর আড়ম্বরের চেয়ে ভক্তের ভক্তি ও শুদ্ধ মনেই বেশি সন্তুষ্ট হন। তবে উপচারের শুদ্ধতা এবং শাস্ত্রীয় বিধিনিষেধের বিচারে ধুনোর স্থান অনেক উঁচুতে। তাই সম্ভব হলে নিত্যপুজোয় ধুনো ব্যবহার করাই শ্রেয়। আর সময়ের অভাবে ধূপকাঠি ব্যবহার করতে হলে অবশ্যই তা যেন বাঁশহীন এবং প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে তৈরি ভেষজ ধূপকাঠি হয়। এতে শাস্ত্রের নিয়ম রক্ষা পাবে, পাশাপাশি আপনার স্বাস্থ্যও থাকবে সুরক্ষিত।





