বর্ষায় প্রকৃতির আসল রূপ দেখতে চান? হিরাকুদ জলাধার ঘেরা এই বন্যপ্রাণ অভয়ারণ্য এক্কেবারে পারফেক্ট!

কলকাতার ভ্যাপসা গরম, ধুলোবালি আর একটানা ট্রাফিক জ্যামের ব্যস্ততা থেকে দুদিনের জন্য একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে চাইলে ব্যাগ গুছিয়ে চোখ বুজে বেরিয়ে পড়তে পারেন দেবরিগড়ের উদ্দেশ্যে। ওড়িশার বরগড় জেলায় অবস্থিত এই নয়নাভিরাম স্থানটি পর্যটকদের কাছে এক স্বর্গরাজ্য বললেই চলে। বিখ্যাত হিরাকুদ জলাধারের একপাশ ঘেঁষে প্রায় ৩৪৭ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত রয়েছে এই সুরক্ষিত বন্যপ্রাণ অভয়ারণ্য। কলকাতা থেকে ট্রেন কিংবা নিজের গাড়িতে চেপে এখানে পৌঁছাতে সময় লাগে মাত্র ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা। তাই শুক্রবার রাতে অফিস সেরে বা উইকেন্ডে বেরিয়ে রবিবারেই অনায়াসে ঘরে ফেরার প্ল্যান বানিয়ে ফেলা যায়।

বর্ষাকালে কেন যাবেন দেবরিগড়ে?
বর্ষার ঋতুতেই দেবরিগড় তার আসল ও অপরূপ রূপ মেলে ধরে। চারপাশের ঘন জঙ্গল তখন একেবারে গভীর সবুজে সেজে ওঠে। গাছের পাতার ফাঁকফোকর দিয়ে নরম রোদ যখন মাটিতে এসে পড়ে এবং সোঁদা মাটির গন্ধ চারপাশ মাত করে, তখন এক অপূর্ব পরিবেশ তৈরি হয়। হিরাকুদ জলাধারের জলও এই সময়ে কানায় কানায় ভরে থাকে। বর্ষার মরশুমে বনের ভিতরকার জীববৈচিত্র্য সবচেয়ে বেশি প্রাণবন্ত থাকে। হরিণের দল, বিশালকায় বাইসন, সম্বর এবং নীলগাইয়ের দল তৃষ্ণা মেটাতে জলের খোঁজে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসে। এছাড়া এখানে পাখির সংখ্যাও চোখে পড়ার মতো; প্রায় ২৫০ প্রজাতির নানা রঙের পাখি দেখা মেলে এই অভয়ারণ্যে। আপনার কপাল যদি সত্যিই ভালো থাকে, তবে জঙ্গল সাফারির রোমাঞ্চকর সময়ে একটি লেপার্ড বা বুনো ভাল্লুকের দেখাও পেয়ে যেতে পারেন।

দেবরিগড় পৌঁছে কী কী করবেন?
এখানে পা রাখার পর সবার আগে যে কাজটি আপনার করা উচিত, তা হলো রোমাঞ্চকর জঙ্গল সাফারি। পর্যটকদের জন্য সকাল এবং বিকেল—দুবেলাতেই সরকারি জিপসি ছাড়ার ব্যবস্থা রয়েছে এবং প্রতিবারই অভিজ্ঞ গাইড সঙ্গে থাকেন। জঙ্গলের ছোট ও সরু এবড়োখেবড়ো রাস্তা দিয়ে জিপসি এগিয়ে যাওয়ার সময় বন্যপ্রাণী দেখার রোমাঞ্চই একেবারে আলাদা। সফল সাফারি শেষ করার পর যদি হাতে পর্যাপ্ত সময় থাকে, তবে হিরাকুদ জলাধারের বুকে বোটিং করার সুযোগ কোনোভাবেই হাতছাড়া করবেন না। উল্লেখ্য, এটি এশিয়ার দীর্ঘতম মাটির বাঁধ। বোটে করে বিশাল জলের ঠিক মাঝে ছোট ছোট দ্বীপের মতো ভেসে থাকা জায়গাগুলোতে ঘুরে আসার অভিজ্ঞতা আপনাকে সারাজীবন মনে রাখবে।

থাকা এবং অ্যাডভেঞ্চারের দুর্দান্ত বন্দোবস্ত
পর্যটকদের থাকার জন্য ওড়িশা সরকারের পক্ষ থেকে একেবারে গভীর জঙ্গলের ভেতরেই অত্যন্ত মনোরম ইকো কটেজের সুব্যবস্থা করা হয়েছে। কটেজের জানলা খুলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সবুজ জঙ্গল আর দূরে হিরাকুদের বিশাল নীল জলরাশি। আর যারা একটু বেশি অ্যাডভেঞ্চার বা রোমাঞ্চ পছন্দ করেন, তাদের জন্য এখানে রয়েছে তাঁবু বা টেন্টে রাত কাটানোর চমৎকার ব্যবস্থা। রাতে বনের ভেতর অচেনা প্রাণীর ও পাতার মর্মর শব্দ শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ার অভিজ্ঞতা এককথায় অতুলনীয়। এছাড়া অভিজ্ঞ গাইডকে সঙ্গে নিয়ে ছোটখাটো ট্রেকিং করতে পারেন কিংবা পাশের শান্ত আদিবাসী গ্রামগুলো ঘুরে স্থানীয় সংস্কৃতি চিনে নিতে পারেন।

কীভাবে এবং কোন সময়ে যাবেন?
কলকাতা থেকে দেবরিগড় যাওয়ার সবচেয়ে সহজ এবং সুবিধাজনক মাধ্যম হলো ট্রেন। সম্বলপুরগামী যেকোনো ট্রেনে চেপে বরগড় রোড বা সম্বলপুর স্টেশনে নেমে সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে মাত্র এক ঘণ্টা ড্রাইভ করলেই পৌঁছে যাওয়া যায়। আর যদি সড়কপথে যেতে চান, তবে এনএইচ-১৬ (NH-16) ধরে সোজা বরগড় হয়ে দেবরিগড় পৌঁছে যাওয়া সম্ভব। বর্ষাকাল থেকে শুরু করে শীতকাল অর্থাৎ জুলাই মাস থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত হলো এখানে বেড়াতে যাওয়ার আদর্শ সময়। বর্ষায় প্রকৃতির রূপ সবচেয়ে বেশি মনোরম লাগে, আবার অক্টোবর থেকে মার্চ মাসের আবহাওয়া সাফারির জন্য সবচেয়ে সেরা। তবে যাওয়ার আগে অবশ্যই অনলাইনে ইকো কটেজ এবং সাফারির স্লট বুক করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে, বিশেষ করে উইকেন্ডে পর্যটকদের বেশ ভালোই ভিড় হয়। ভ্রমণের সময় একটি কথা অবশ্যই মনে রাখবেন, অভয়ারণ্যের ভেতরে কখনোই প্লাস্টিক ফেলবেন না। কলকাতার এত কাছাকাছি জঙ্গল, জলাধার এবং বন্যপ্রাণের এমন অপূর্ব সমাহার আর কোথাও খুঁজে পাবেন না।