তসলিমার মুখে হাসিনার পক্ষে বিস্ফোরক দাবি! ৩২ বছরের নির্বাসন কাটিয়ে দেশে ফেরার আকুল আর্তি

দেশ থেকে নির্বাসিত প্রখ্যাত লেখিকা তসলিমা নাসরিন বাংলাদেশের রাজনীতি ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও জোরালো মন্তব্য করেছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় দাবি তুলেছেন যে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অবিলম্বে বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হোক এবং তাঁর রাজনৈতিক দলটির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হোক। বুধবার সকালে কলকাতা থেকে প্রস্থান করার প্রাক্কালে বিমানবন্দর চত্বরে উপস্থিত সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তসলিমা নাসরিন এই বিস্ফোরক মন্তব্য করেন। তাঁর এই মন্তব্য ঘিরেই বর্তমানে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা ও কৌতূহলের সৃষ্টি হয়েছে।
চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে পানিহাটিতে অবস্থিত নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তর্য অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানান তসলিমা। সেখানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন যে, বর্তমান বাংলাদেশ সরকার ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার দলীয় কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে, যা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। তিনি মনে করেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের মুক্তভাবে রাজনীতি করার এবং বিরোধী দল হিসেবে নিজেদের মতামত প্রকাশ করার পূর্ণ অধিকার থাকা উচিত। তিনি নিজে সম্পূর্ণভাবে ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী উল্লেখ করে জানান যে, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি মূলত সবসময়ই নারীবিদ্বেষী চরিত্র বহন করে। তাই দেশের গণতান্ত্রিক ধারাকে টিকিয়ে রাখতে হলে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বাদ দিয়ে সব পক্ষকে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া জরুরি।
দীর্ঘ ৩২ বছর ধরে দেশছাড়া থাকার যন্ত্রণার কথা তুলে ধরে তসলিমা নাসরিন জানান যে, তিনি শুধু শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনই চান না, তিনি নিজে মর্যাদার সঙ্গে নিজের জন্মভূমিতে ফিরে যেতে চান। কিন্তু প্রশাসনিক বাধা এবং পরিস্থিতির কারণে তাঁকে বারবার বঞ্চিত করা হচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ সরকার তাঁর পাসপোর্ট নবায়ন করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে এবং তাঁর বর্তমান সুইডিশ পাসপোর্টেও প্রয়োজনীয় ভিসা প্রদান করা হচ্ছে না। বৈধ সরকারি নথি বা ভিসার অনুপস্থিতির কারণেই তিনি আইনগতভাবে নিজের দেশে ফিরতে পারছেন না বলে আক্ষেপ প্রকাশ করেন। তসলিমার এই মন্তব্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
কলকাতা সফর প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তসলিমা নাসরিন অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তিনি জানান যে, দীর্ঘ প্রায় ১৯ বছর পর ভারতে এসে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে তিনি যে অভূতপূর্ব ভালোবাসা ও সম্মান পেয়েছেন, তা তাঁকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। কোলকাতার স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, এখানকার মানুষের উষ্ণ অভ্যর্থনা দেখে তাঁর চোখ জল এসে গিয়েছিল। আগামী দিনে তিনি আবারও কলকাতায় ফিরে আসার পরিকল্পনা করছেন। বিশেষ করে আসছে অক্টোবর মাসে অথবা আগামী বইমেলার সময় তিনি নিশ্চিতভাবে শহরে আসবেন বলে জানিয়েছেন। তবে দুর্গাপুজোর সময় তিনি অন্য দেশে অবস্থান করবেন বলে কলকাতা সফর হয়তো সম্ভব হবে না।
গত ৩১ জুলাই সেক্যুলার মিশনসহ মোট তিনটি ভিন্ন সংগঠনের বিশেষ আমন্ত্রণে কলকাতায় এসেছিলেন এই নারীবাদী লেখিকা। তাঁর এই সাম্প্রতিক পশ্চিমবঙ্গ সফরজুড়ে ছিল অত্যন্ত কড়া নিরাপত্তা বলয়। কলকাতার ঐতিহ্যবাহী রবীন্দ্র সদন মিলনায়তনে আয়োজিত একটি বিশেষ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে সংবর্ধনা জানানো হয়। কলকাতার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে তাঁর এই উপস্থিতি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। কলকাতার মানুষের এই অফুরন্ত ভালোবাসা ও শহরের আতিথেয়তা সঙ্গে নিয়ে তিনি পুনরায় নিজের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন, যা তাঁর দীর্ঘ নির্বাসিত জীবনের এক অন্যতম উল্লেখযোগ্য অধ হয়ে রইল।