“বয়স বা মেডিক্যাল সার্টিফিকেট যাচাইয়ের অধিকার নেই ম্যাজিস্ট্রেটের!” সারোগেসি মামলায় কড়া পর্যবেক্ষণ কলকাতা হাইকোর্টের

সারোগেট মায়ের মেডিক্যাল সার্টিফিকেট যাচাই করা বা তা খতিয়ে দেখা বিচারবিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটের এক্তিয়ারভুক্ত কাজ নয়। কোনো মহিলা সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় এবং নিজের স্বাধীন সিদ্ধান্তে সারোগেট মা হতে রাজি হয়েছেন কি না, শুধুমাত্র তা নিশ্চিত করাই ম্যাজিস্ট্রেটের মূল কাজ। সারোগেসির মাধ্যমে সন্তান লাভে ইচ্ছুক এক দম্পতির দায়ের করা মামলার রায়দান করতে গিয়ে এমনই স্পষ্ট ও তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ জানাল কলকাতা হাইকোর্ট। মামলার রায় ঘোষণা করেছেন বিচারপতি কৌশিক চন্দ।

সারোগেসি আইনের অধীনে ম্যাজিস্ট্রেটের আইনি ক্ষমতা ও পরিধি কতখানি, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিচারপতি কৌশিক চন্দ তাঁর রায়ে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, “সারোগেসি আইনের অধীনে ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। সংশ্লিষ্ট দম্পতির বয়স কত, কিংবা তাঁদের কাছে সঠিক মেডিক্যাল সার্টিফিকেট রয়েছে কি না—ম্যাজিস্ট্রেট সেই সমস্ত বিষয়ে কোনোভাবেই নাক গলাতে পারেন না। এই ধরনের কারিগরি বিষয়গুলি খতিয়ে দেখার জন্য নির্দিষ্ট উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ বা বোর্ড রয়েছে।” আদালত আরও জানিয়েছে যে ম্যাজিস্ট্রেটের একমাত্র কাজ হলো এটি নিশ্চিত করা যে সারোগেট মা নিজের স্বাধীন ইচ্ছায় স্বেচ্ছায় সম্মতি দিয়েছেন কি না, তাঁর ওপর কোনো ধরনের জবরদস্তি বা প্রতারণা করা হয়েছে কি না, এবং ভবিষ্যতে তিনি সন্তানের অভিভাবকত্ব দাবি করবেন না—এই সমস্ত শর্তগুলি সঠিকভাবে পালিত হচ্ছে কি না।

এই মামলার প্রেক্ষিতে কলকাতা হাইকোর্ট গত ২০ জুলাই মুখ্য বিচারবিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটের (CJM) নেওয়া বিতর্কিত নির্দেশ সম্পূর্ণ খারিজ করে দিয়েছে। আদালত জানিয়েছে যে, সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেটকে আগামী সাত দিনের মধ্যে নতুন করে দম্পতির আবেদন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে শুনে যথাযথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ করে ওই দম্পতিকে আইনি লড়াইয়ের কারণে আদালতের কার্যক্রমে যে দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে হয়েছে, সেই বিষয়টিও নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ম্যাজিস্ট্রেটকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় রাখতে হবে।

উল্লেখ্য, দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাসিন্দা এক দম্পতি সারোগেসির মাধ্যমে সন্তান লাভ করতে চেয়ে আলিপুর আদালতের অতিরিক্ত জেলা বিচারকের কাছে সুনির্দিষ্ট আবেদন করেছিলেন। আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার আগে ওই দম্পতি সংশ্লিষ্ট জেলা মেডিক্যাল বোর্ড থেকে প্রয়োজনীয় সমস্ত আইনি ও চিকিৎসা সংক্রান্ত শংসাপত্র সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু অভিযোগ ওঠে যে, ম্যাজিস্ট্রেট দম্পতির মেডিক্যাল শংসাপত্র এবং সারোগেট মায়ের বিভিন্ন সার্টিফিকেট খুঁটিয়ে যাচাই করে তাঁদের সেই আবেদন খারিজ করে দিয়েছিলেন।

ম্যাজিস্ট্রেটের তরফ থেকে জানানো হয়েছিল যে, দম্পতির জমা দেওয়া শংসাপত্রগুলির আইনি বৈধতার মেয়াদ ইতিমধ্যেই শেষ হয়ে গিয়েছে। এমনকি সারোগেট মায়ের মানসিক সুস্থতা সংক্রান্ত শংসাপত্রেও প্রয়োজনীয় তথ্যের যথেষ্ট অভাব রয়েছে বলে দাবি করা হয়। তাছাড়া, আবেদনকারী স্বামীর বয়স নিয়েও তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন ম্যাজিস্ট্রেট। তাঁর যুক্তি ছিল, স্বামীর বয়স ৫৫ বছর পেরিয়ে যাওয়ায় তিনি সারোগেসির মাধ্যমে সন্তান নেওয়ার উপযুক্ত নন। ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের এই একপাক্ষিক ও নেতিবাচক নির্দেশকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানিয়েই শেষ পর্যন্ত হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন ওই দম্পতি।