শুধু কড়া আইনে কি চলবে দেশ? প্রশ্নফাঁস রোধে নতুন বিল নিয়ে মোদী সরকারকে চরম বার্তা সোনম ওয়াংচুকের

দেশজুড়ে তীব্র পরীক্ষা বিতর্ক এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো গুরুতর জালিয়াতি রোধ করতে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে সংসদে নতুন বিল আনার প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে। এই পদক্ষেপকে নীতিগতভাবে স্বাগত জানালেও দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ তথা খ্যাতনামা পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুক সরাসরি কেন্দ্র সরকারকে এক কঠোর বার্তা দিয়েছেন। তাঁর স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন বক্তব্য, কেবল খাতার কাগজে কঠোর আইন তৈরি করে বা পরীক্ষা নেওয়ার নিয়মে সাময়িক কড়াকড়ি করে কখনো শিক্ষা ব্যবস্থার অন্তর্ধ্বংস ঠেকানো সম্ভব নয়। এর জন্য দেশের সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থাকে একেবারে নিচুতলা থেকে ঢেলে সাজাতে হবে এবং আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। একই সঙ্গে তিনি নিট (NEET) পরীক্ষা কেলেঙ্কারির প্রতিবাদে আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীদের বিরুদ্ধে পুলিশের পক্ষ থেকে দায়ের হওয়া সমস্ত মিথ্যা এফআইআর অবিলম্বে প্রত্যাহার করার এবং অতীতে সরকারের দেওয়া কথা ও প্রতিশ্রুতি অক্ষরে অক্ষরে পালন করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন।
সম্প্রতি দেশজুড়ে আলোচিত নিট-ইউজি (NEET-UG) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও ব্যাপক অনিয়মের প্রতিবাদে রাজধানীর যন্তর মন্তরে আয়োজিত টানা বিক্ষোভে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন সোনম ওয়াংচুক। সরকারের ঘুম ছুটিয়ে দেওয়া সেই ঐতিহাসিক আন্দোলনে একটানা ২৬ দিন ধরে সম্পূর্ণ অনশন চালিয়ে যাওয়ার পর তাঁর শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটে। বাধ্য হয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাঁকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে গিয়ে দিল্লির সফদরজং হাসপাতালে ভর্তি করায়। পরবর্তী সময়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে মেদান্ত হাসপাতালেও স্থানান্তরিত করা হয়। অবশেষে হাসপাতাল থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে নিজের জন্মভূমি লাদাখে ফেরার পথেই সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি বিশেষ ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেন তিনি, যা মুহূর্তের মধ্যে রাজনৈতিক মহলে তীব্র আলোচনার সৃষ্টি করেছে।
দিল্লি থেকে সরাসরি শ্রীনগরগামী দেশের আধুনিক বন্দে ভারত এক্সপ্রেসে চেপে বাড়ি ফেরার রোমাঞ্চকর প্রথম অভিজ্ঞতা সকলের সাথে শেয়ার করতে গিয়ে সোনম ওয়াংচুককে বেশ উচ্ছ্বসিত দেখা যায়। ভিডিও বার্তায় তিনি ভারতীয় রেলের আমূল পরিবর্তন এবং পরিকাঠামোগত সাফল্যের ভূয়সী প্রশংসা করেন। বিশেষ করে জম্মু-কাশ্মীরের দুর্গম পাহাড়ের বুকে নির্মিত বিশ্বখ্যাত চেনাব ব্রিজের স্থাপত্যের প্রশংসা করে তিনি বলেন যে, এই ধরনের মেগা পরিকাঠামোগত অগ্রগতিই প্রমাণ করে ভারত কীভাবে বিশ্বমঞ্চে দ্রুত এগিয়ে চলেছে। রেল ব্যবস্থার প্রশংসার পাশাপাশি চেনা ছন্দে মোদী সরকারকে কটাক্ষ করতেও ছাড়েননি তিনি। সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে নিজের পোস্টের ক্যাপশনে তিনি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে লিখেছিলেন যে, ভারতীয় রেলের অসাধারণ অগ্রগতি দেখে আজ তাঁর দারুণ গর্ব হচ্ছে, ঠিক তেমনি তিনি দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের দেওয়া প্রতিশ্রুতি ও কথা রক্ষা করার সদিচ্ছা নিয়েও একইভাবে গর্বিত হতে চান।
আন্দোলন চলাকালীন ঘটে যাওয়া পুলিশি দমনপীড়ন এবং শিক্ষার্থীদের ওপর নেমে আসা খড়্গ নিয়ে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেন ওয়াংচুক। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, যন্তর মন্তরের সেই তীব্র আন্দোলন যখন চরমে পৌঁছেছিল, তখন সরকারের পক্ষ থেকে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজিপি) এবং আন্দোলনকারী নেতৃত্বকে লিখিত আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল যে, এই ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কোনোও ছাত্রছাত্রী বা প্রতিবাদীর বিরুদ্ধে কোনো রকম আইনি পদক্ষেপ বা ফৌজদারি এফআইআর করা হবে না। সেই প্রতিশ্রুতির কথা সরকারের মনে করিয়ে দিয়ে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “একটি শক্তিশালী, সুসংহত ও উন্নত ভারত গড়ে তোলার জন্য সবার আগে দেশের তরুণ প্রজন্মের মনে আস্থার পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। সেই কারণেই দেশের ছাত্রসমাজের ওপর থেকে সমস্ত অনাবশ্যক আইনি চাপ ও খাঁড়া অবিলম্বে তুলে নেওয়া উচিত।”
উল্লেখ্য, গত ২৮ জুন থেকে সিজিপির ডাকে দেশব্যাপী অনশন আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন এই প্রবীণ সমাজকর্মী। টানা ২৬ দিন একটানা অনশন বজায় রাখায় তাঁর জীবন সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছিল। গত ১৮ জুলাই পুলিশি হস্তক্ষেপে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর তাঁকে নজরবন্দি বা ডিটেনশনে রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে চিকিৎসায় কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর তিনি দিল্লির ঐতিহাসিক রাজঘাটে গিয়ে মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানান এবং সেখান থেকেই লাদাখের উদ্দেশ্যে রওনা হন। অন্যদিকে, দেশজুড়ে চলা লাগাতার ছাত্র আন্দোলনের প্রবল চাপের মুখে পড়ে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিতে বাধ্য হয়েছেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। শিক্ষামন্ত্রীর এই পদত্যাগের পরেই আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেয় সিজিপি। এখন দেখার, সোনম ওয়াংচুকের এই হুঙ্কারের পর কেন্দ্র সরকার আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নিয়ে কতটা ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করে।