ফুটপাথে মহিলার ওপর চিৎকার করে চরম অনুতপ্ত মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা! রাখির দিন কী এমন করলেন যে বদলে গেল সব?

পার্ক স্ট্রিটের ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের ফুটপাথে এক মহিলার দুধ গরম করাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিতর্কের রেশ কাটতে না কাটতে নিজের অবস্থান নিয়ে আরও এক ধাপ নরম হলেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। ঘটনার দিন ওই মহিলার ওপর উচ্চস্বরে মেজাজ হারানোর পর প্রথমে নিজের ভুল স্বীকার করলেও, শুক্রবার গড়িয়াহাটের রাখিবন্ধন উৎসবের মঞ্চ থেকে তিনি আরও এক ধাপ এগিয়ে সরাসরি নিজের ক্ষোভ প্রকাশের পদ্ধতিকে ‘অন্যায়’ বলে কবুল করলেন। মন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিলেন যে, ফুটপাথে স্টোভ জ্বালিয়ে দুধ গরম করা অত্যন্ত বিপজ্জনক হওয়ায় তিনি আপত্তি জানালেও, সেই প্রতিবাদ জানানোর ভঙ্গি বা চিৎকার করাটা তাঁর দিক থেকে সম্পূর্ণ ভুল ও অন্যায় ছিল।
ঘটনার সূত্রপাত কয়েকদিন আগে, যখন ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের ফুটপাথে এক অসহায় মহিলাকে স্টোভ জ্বালিয়ে দুধ গরম করতে দেখে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন অগ্নিমিত্রা। সেই ঘটনার একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হতেই রাজনৈতিক মহলে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র সমালোচনার ঝড় ওঠে। প্রশ্ন ওঠে, একজন জনপ্রতিনিধির এহেন আচরণ কতটা সংবেদনশীল। প্রথমে বুধবার নিজের সাফাইয়ে তিনি শুধু মেজাজ হারানোর ভুল স্বীকার করলেও, শুক্রবার গড়িহাটে আয়োজিত রাখিবন্ধন উৎসবে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি আরও স্পষ্ট সুরে বলেন, “সেদিন ওভাবে বলাটা আমার অন্যায় হয়ে গেছে।” তবে নিজের প্রতিবাদের মূল যুক্তি থেকে একচুলও সরে দাঁড়াননি তিনি। মন্ত্রীর জোরালো যুক্তি, “আমি ফুটপাথবাসীদের বিরুদ্ধে নই। কিন্তু ফুটপাথের ওপরে ওইভাবে স্টোভ জ্বালিয়ে দুধ গরম করা বিপজ্জনক। ওই দিদি নিজের এবং নিজের ছ’মাসের বাচ্চার বিপদ ডেকে আনছিলেন। ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের মতো জনবহুল জায়গায় ওইভাবে রান্না করলে যেকোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারত।”
পাশাপাশি, সমালোচকদের জবাব দিতে গিয়ে ওই মহিলার পুনর্বাসন ও বর্তমান অবস্থার কথাও সংবাদমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেন অগ্নিমিত্রা। তাঁর দাবি, ঘটনার পরেই ওই মহিলাকে একটি সরকারি শেল্টার হোমে স্থানান্তরিত করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তিনি সেখানে থাকতে অস্বীকার করেন। পরবর্তীতে ওই মহিলার ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়েই তাঁর জন্য বিকল্প ব্যবস্থার বন্দোবস্ত করা হয়েছে। মন্ত্রীর দাবি অনুযায়ী, ইতিমধ্যেই বৃহস্পতিবার ওই মহিলার জন্য একটি হোটেলে সম্মানজনক চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, ওই মহিলা যেহেতু তপসিয়া এলাকায় থাকতে চেয়েছিলেন, তাই সেখানে তাঁর থাকার জন্য একটি বাড়ির ব্যবস্থাও করে দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। ফলে একদিকে নিজের পূর্বের আচরণের জন্য প্রকাশ্যে ভুল স্বীকার এবং অন্যদিকে ওই মহিলার পুনর্বাসনের সুব্যবস্থা করার জোরালো দাবি—এই দুই বিপরীতমুখী বার্তা এদিন একই সঙ্গে স্পষ্ট করে দিলেন অগ্নিমিত্রা পাল।
এদিকে শুক্রবার রাখি পূর্ণিমা উপলক্ষে রাজ্যজুড়ে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে বঙ্গ বিজেপি। তারই অঙ্গ হিসেবে রাসবিহারী বিধানসভা এলাকার ব্যস্ততম গড়িয়াহাট মোড়ে রাজ্য মহিলা মোর্চার উদ্যোগে এক বর্ণাঢ্য রাখিবন্ধন উৎসবের আয়োজন করা হয়। সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল এবং বিশিষ্ট নেতা স্বপন দাশগুপ্ত। অনুষ্ঠানের শুরুতে মহিলা মোর্চার সদস্যােরা স্বপন দাশগুপ্তের হাতে রাখি পরিয়ে দেন। এরপর খোদ অগ্নিমিত্রা পালকে দেখা যায় সম্পূর্ণ অন্য মেজাজে। গড়িহাট মোড়ের ফুটপাথ ধরে হেঁটে তিনি সাধারণ পথচারী, গাড়িচালক থেকে শুরু করে ফুটপাথে বসবাসকারী দুঃস্থ মানুষের হাতেও পরম স্নেহে রাখি পরিয়ে দেন। এমনকী রাস্তায় কর্তব্যরত পুলিশকর্মীদের হাতেও রাখি পরান তিনি। সবচেয়ে আকর্ষক বিষয় হলো, কয়েক দিন আগে যে ফুটপাথে স্টোভ জ্বালানো নিয়ে মন্ত্রীকে কেন্দ্র করে বিতর্কের ঝড় উঠেছিল, আজ সেই একই ফুটপাথের দুস্থ ও অবহেলিত শিশুদের হাতে রাখি পরিয়ে দিতে দেখা গেল তাঁকে। শুধু রাখি পরাণোই নয়, ওই শিশুদের হাতে তুলে দেওয়া হয় ‘বর্ণপরিচয়’ বই, বিভিন্ন পড়াশোনার সামগ্রী, চকলেট এবং লাড্ডু। একদিকে নিজের ভুল স্বীকার আর অন্যদিকে রাখির দিনে ফুটপাথবাসীদের সঙ্গে এই হৃদ্যতাপূর্ণ মেলবন্ধন—সব মিলিয়ে শুক্রবারের এই রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচি রাজ্য রাজনীতিতে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।