ফিফার বাণিজ্যিকীকরণে জোরালো ধাক্কা! উয়েফার পথেই হেঁটে ইনফান্তিনোর আর্থিক পরিকল্পনা খারিজ কনকাকাফের

গতকালই ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর উচ্চাভিলাষী আর্থিক লাভের পরিকল্পনায় চরম জল ঢেলে দিয়েছিল ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ামক সংস্থা উয়েফা (UEFA)। তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছিল যে, ফুটবল বিশ্বকাপের বেসরকারিকরণ করা হলে তারা বিশ্বকাপসহ ফিফার আওতাধীন কোনো প্রতিযোগিতাতেই অংশগ্রহণ করবে না। আর ঠিক সেই একই সুরে সুর মেলাল উত্তর-মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের ফুটবল সংস্থা কনকাকাফ (Concacaf)। তারাও স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, ফিফার এই বিতর্কিত প্রস্তাব তারা কোনোভাবেই মানছে না। এর ফলেই ফিফা সভাপতির কাঙ্ক্ষিত বাণিজ্যিক পরিকল্পনাটি এক বিরাট এবং মারাত্মক ধাক্কা খেল। ফুটবল মহলের মতে, এই সম্মিলিত সিদ্ধান্তের জেরে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি ও স্পেনের মতো ইউরোপের পরাশক্তি দেশগুলির পাশাপাশি ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনার মতো দক্ষিণ আমেরিকার ঐতিহ্যবাহী দেশগুলিও ভবিষ্যৎ বিশ্বকাপ বয়কট করার তীব্র পথ বেছে নিতে পারে।

মূলত জিয়ান্নি ইনফান্তিনো চাচ্ছেন ফিফার একটি নতুন বাণিজ্যিক সত্তা তৈরি করতে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজেস’। এর মাধ্যমে তিনি ফিফার বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করতে উদ্যোগী হয়েছেন। ইনফান্তিনোর দাবি ছিল যে, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ফিফার কোষাগারে ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় হবে। তবে এর বিনিময়ে ওই বেসরকারি বিনিয়োগকারী সংস্থাটি ভবিষ্যতের ফিফা বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব, স্পনসরশিপ এবং সমস্ত বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও একচ্ছত্র কথা বলার অধিকার পাবে। এই বিশাল বিনিয়োগের নেপথ্যে রয়েছেন বিশিষ্ট মার্কিন ব্যবসায়ী জোশুয়া কুশনার, যিনি মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাই জ্যারেড কুশনারের ভাই। ইনফান্তিনোর প্রবল যুক্তি ছিল যে, এই আর্থিক পরিকল্পনা সফলভাবে কার্যকর হলে আগামী ২০৩৭ সাল অবধি ফিফার অন্তর্ভুক্ত ২১০টি সদস্য দেশের প্রত্যেকে ৮ কোটি ডলারেরও বেশি করে আর্থিক অনুদান পাবে। সদস্য দেশগুলিকে আগামী ১৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে এই প্রস্তাবের ওপর ভোট দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

তবে ফিফা সভাপতির এই দূরপসারী পরিকল্পনা শুরু থেকেই সর্বস্তরে সমর্থিত হয়নি। শুরুতেই উয়েফা এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে সাফ জানিয়ে দেয় যে, ফুটবল কোনো একক ব্যক্তির বা সংস্থার ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, ফলে ফুটবলের বেসরকারিকরণ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। শুধু উয়েফাই নয়, কনকাকাফও ফিফার এই অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের জোরালো দাবি, ফিফা কোনো সঠিক নিয়ম বা স্বচ্ছ প্রক্রিয়া মেনে এই একপাক্ষিক প্রস্তাব পেশ করছে না। এখানেই শেষ নয়, এশিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি শেখ সলমন বিন ইব্রাহিম আল খলিফাও এই বিতর্কিত পরিকল্পনা নিয়ে নিজের গভীর উদ্বেগের কথা প্রকাশ্যে জানিয়েছেন। তাঁর দ্ব্যর্থহীন মত, ফুটবলের সঙ্গে যুক্ত বিশ্বের সবকটি মহাদেশের স্পষ্ট সমর্থন ও ঐক্যমত ছাড়া এ ধরনের সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত কখনো সফল হওয়া সম্ভব নয়।

বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপের ৫৫টি এবং উত্তর-মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের ৪১টি—সবমিলিয়ে মোট ৯৬টি দেশের ফুটবল ভবিষ্যৎ এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে আগামী মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত হতে চলা ফিফা সভাপতি নির্বাচনের ঠিক আগে জিয়ান্নি ইনফান্তিনো রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে আরও কঠিন বিপাকে পড়েছেন বলেই মনে করছে আন্তর্জাতিক ফুটবল মহল।