“প্রমান নেই…”-২০০৬ মুম্বই লোকাল ট্রেন বিস্ফোরণ, ১১ অভিযুক্তকে বেকসুর খালাস হাইকোর্টের

২০০৬ সালের মুম্বই লোকাল ট্রেন বিস্ফোরণ মামলায় এক যুগান্তকারী রায়ে বম্বে হাইকোর্ট আজ ১১ জন অভিযুক্তকে নির্দোষ ঘোষণা করেছে। বিচারপতি অনিল কিলোর এবং বিচারপতি এস.জি. চন্দকের ডিভিশন বেঞ্চের এই রায় তদন্তকারী সংস্থাগুলির জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। উল্লেখ্য, নিম্ন আদালত এই মামলায় মোট ১২ জন অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করেছিল, যার মধ্যে ৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৭ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। তবে, হাইকোর্টের চূড়ান্ত শুনানির পর ১১ জন অভিযুক্ত খালাস পেলেন; একজন অভিযুক্তের আগেই মৃত্যু হয়েছে।

প্রমাণ অবিশ্বস্ত, সাক্ষ্য সন্দেহজনক: হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ

আদালত সূত্রে জানা গেছে, এই মামলার চূড়ান্ত শুনানি চলতি বছরের জানুয়ারিতে সম্পন্ন হয় এবং এরপর রায় সংরক্ষিত রাখা হয়েছিল। ইয়েরওয়াড়া, নাসিক, অমরাবতী এবং নাগপুর জেলে থাকা দোষীরা ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে আদালতে উপস্থিত ছিলেন। হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চ তাদের রায়ে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে “মামলায় উপস্থাপিত প্রমাণ নির্ভরযোগ্য ছিল না” এবং “অনেক সাক্ষীর সাক্ষ্য সন্দেহজনক”। আদালত আরও বলেছে যে অভিযুক্তদের জোরপূর্বক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল এবং তাদের বক্তব্য নেওয়া হয়েছিল, যা আইনত বৈধ নয়।

আদালত তার রায়ে আরও পর্যবেক্ষণ করেছে যে “প্রসিকিউশন সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে”। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে উপস্থাপিত প্রমাণে গুরুতর ত্রুটি ছিল। আসামিপক্ষের যুক্তি, যা শনাক্তকরণ প্যারেডকে চ্যালেঞ্জ করেছিল, সেগুলিকে আদালত ন্যায্য বলে বিবেচনা করেছে। আদালত বলেছে যে কিছু সাক্ষী বছরের পর বছর ধরে নীরব থাকার পর হঠাৎ করে অভিযুক্তকে শনাক্ত করেছিলেন, যা ‘অস্বাভাবিক’। এর আগেও অনেক সাক্ষী একই ধরণের মামলায় হাজির হয়েছিলেন, যা তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। এছাড়া, RDX এবং অন্যান্য উপাদান উদ্ধারের বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।

১৮৯ জনের প্রাণহানি: এক দশক দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া

২০০৬ সালের ১১ জুলাই, মুম্বইয়ের লোকাল ট্রেনের সাতটি স্থানে মাত্র ১১ মিনিটের ব্যবধানে শক্তিশালী বোমা বিস্ফোরণ ঘটেছিল। এই ভয়াবহ ঘটনায় ১৮৯ জন নিরীহ মানুষ প্রাণ হারান এবং ৮২৪ জন আহত হন। বোমাগুলিতে RDX ব্যবহার করা হয়েছিল। এই ঘটনার পর মুম্বই এটিএস (ATS) ২০০৬ সালের নভেম্বরে চার্জশিট দাখিল করে।

এই মামলায়, ২০১৫ সালে একটি বিশেষ আদালত মোট ১২ জন অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করে, যার মধ্যে মোহাম্মদ ফয়সাল শেখ, এহতেশাম সিদ্দিকী, নাভেদ হুসেন খান, আসিফ খান এবং কামাল আনসারী – এই ৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। বাকি ৭ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কামাল আনসারী নামের অভিযুক্ত ২০২২ সালে কোভিড-১৯-এর কারণে জেলে মারা যান।

আসামিপক্ষ নিম্ন আদালতে অভিযোগ করেছিল যে MCOCA আইনের অধীনে রেকর্ড করা স্বীকারোক্তিগুলি ‘জোরপূর্বক’ এবং ‘নির্যাতনের’ মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়েছিল এবং তাই এটি অবৈধ। অন্যদিকে, রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিল যে এটি বিরলতম মামলাগুলির মধ্যে একটি এবং অপরাধীদের শাস্তি ন্যায্য ছিল।

দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া ও বিলম্বের কারণ

২০১৫ সালে হাইকোর্টে এই মামলার শুনানি শুরু হয়, যখন রাষ্ট্রপক্ষ মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করার জন্য একটি আবেদন করে এবং দোষীরাও নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আবেদন জানায়। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারণে, ১১ টিরও বেশি বেঞ্চ পরিবর্তন হয়েছিল। অবশেষে, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে একটি বিশেষ বেঞ্চ গঠন করা হয় এবং ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে শুনানি শেষ করার পর রায় সংরক্ষিত রাখা হয়েছিল।

আদালতের আজকের রায়ে বিচারকরা বলেছেন, “সাক্ষ্য, তদন্ত এবং প্রমাণ শক্তিশালী ছিল না। অভিযুক্তরা প্রমাণ করতে সফল হয়েছে যে তাদের কাছ থেকে জোর করে স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়েছিল।” তারা আরও বলেন, “আমরা আমাদের কর্তব্য পালন করেছি। এটা আমাদের দায়িত্ব ছিল।” এই রায় ২০০৬ সালের মুম্বই লোকাল ট্রেন বিস্ফোরণের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার তদন্ত এবং বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।