প্রধানদের হাত থেকে আর্থিক ক্ষমতা কেড়ে নিচ্ছে রাজ্য! পঞ্চায়েতের দুর্নীতি রুখতে চলতি বিধানসভাতেই আসছে ঐতিহাসিক ও কড়া বিল

গ্রামাঞ্চলের উন্নয়নের স্বার্থে এবং তৃণমূল স্তরে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা লাগামছাড়া আর্থিক দুর্নীতি পুরোপুরি রুখতে এবার এক অত্যন্ত কঠোর ও যুগান্তকারী আইন আনতে চলেছে রাজ্য সরকার। আগামী শনিবারই চলতি বিধানসভার বিশেষ অধিবেশনে এই সংক্রান্ত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নতুন বিল পেশ করা হতে চলেছে। রাজ্য সরকারের এই চাঞ্চল্যকর সিদ্ধান্তের ফলে দীর্ঘদিনের প্রচলিত ব্যবস্থায় এক বিরাট পরিবর্তন আসতে চলেছে, যার জেরে পঞ্চায়েত প্রধানদের হাত থেকে কার্যত সম্পূর্ণ আর্থিক ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে এবং এর পরিবর্তে সমস্ত আর্থিক লেনদেন ও চেক বা বিল পাসের দায়িত্ব সরাসরি পঞ্চায়েত সচিবদের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েত ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম, স্বজনপোষণ এবং সরকারি তহবিল তছরুপের গুরুতর অভিযোগ বারবার সামনে আসছিল। গ্রামের সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যেই অতীতে পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় প্রধান ও নির্বাচিত সদস্যদের হাতে আর্থিক লেনদেনসহ এলাকার উন্নয়নের বহুবিধ ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছিল। রাজ্য সরকারের নিজস্ব বিভিন্ন কল্যাণমূলক প্রকল্প তো বটেই, এমনকি কেন্দ্র সরকারের পাঠানো বিপুল পরিমাণ অর্থও সরাসরি পঞ্চায়েত দপ্তরের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী এতদিন পর্যন্ত পঞ্চায়েত সচিব এবং পঞ্চায়েত প্রধান যৌথভাবে সই করে যেকোনো আর্থিক লেনদেনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতেন। নিয়ম ছিল যে প্রধান ও সচিব—এই দুজনের যৌথ স্বাক্ষর বাধ্যতামূলক না হলে কোনোদিনই কোনো বিল বা চেকের অর্থ পাস করানো সম্ভব হতো না।

কিন্তু সাম্প্রতিক অতীতে দেখা গিয়েছে যে এই যৌথ সইয়ের সুযোগ নিয়েই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের পঞ্চায়েতগুলিতে লাগাতার দুর্নীতি চালানো হয়েছে। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে আর্থিক দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগে বেশ কয়েকজন নির্বাচিত পঞ্চায়েত প্রধান ইতিমধ্যে বিচারাধীন অবস্থায় জেলবন্দি রয়েছেন। রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সংশ্লিষ্ট সরকার গোটা পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকে একেবারে গোড়া থেকে ঢেলে সাজানোর সুদৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। তারই প্রথম ও অত্যন্ত কড়া পদক্ষেপ হিসেবে আর্থিক ক্ষমতার এই ব্যাপক রদবদলের নতুন বিল আনা হচ্ছে।

এই প্রসঙ্গে রাজ্য সরকারের পঞ্চায়েত মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, পঞ্চায়েত স্তরের সর্বগ্রাসী চুরি ও আর্থিক দুর্নীতি চিরতরে বন্ধ করতেই এই বিশেষ বিল আনা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছিল। নতুন আইন পাস হয়ে গেলে গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধানের হাতে আর কোনো ধরনের আর্থিক ক্ষমতা বা চেকবুকে সই করার একচ্ছত্র অধিকার থাকবে না। এর পরিবর্তে সম্পূর্ণ প্রশাসনিক ও আর্থিক দায়িত্ব নিজেদের হাতে তুলে নেবেন সরকারিভাবে নিযুক্ত পঞ্চায়েত সচিবরাই। তাঁরাই সুশৃঙ্খলভাবে সমস্ত আর্থিক বিষয়গুলি আইনসম্মত উপায়ে সামলাবেন। রাজনৈতিক মহলের মতে, সরকারের এই কঠোর পদক্ষেপ আগামী দিনে গ্রামীণ এলাকার দুর্নীতি দমনে এক বিরাট প্রভাব ফেলবে।