প্রত্নতত্ত্ববিদ কালিদাস দত্তের ১৩১তম জন্মদিবস! কেন জমিদার বাড়িটিকে অধিগ্রহণ করে মিউজিয়াম করার দাবি উঠল?

অবিভক্ত চব্বিশ পরগনার ইতিহাস চর্চার পথিকৃৎ, প্রয়াত প্রত্নতত্ত্ববিদ শ্রদ্ধেয় কালিদাস দত্তের (১৮৯৫-১৯৬৮) ১৩১তম জন্মদিবসে তাঁর মজিলপুরের পৈতৃক বাড়িটিকে ‘ঐতিহ্য ভবন’ (হেরিটেজ বিল্ডিং) হিসাবে সরকারিভাবে ঘোষণা করে অধিগ্রহণ এবং একটি সংগ্রহশালায় রূপান্তরিত করার জোর দাবি উঠল জয়নগরে।

প্রত্নতাত্ত্বিক কালিদাস দত্তের স্মৃতিরক্ষার জন্য গঠিত একটি কমিটির উদ্যোগে জয়নগর মজিলপুর জে এম টেনিং স্কুলে আলোচনা সভা ও মজিলপুর থেকে তাঁর বাড়ি পর্যন্ত এক নীরব পদযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষজন এই কর্মসূচিতে অংশ নেন। এদিনের সভা থেকে তাঁর মজিলপুর কালিদাস দত্ত রোডের দ্বিতল বাড়িটিকে হেরিটেজ ঘোষণা করার এবং সেখানে তাঁর নামে একটি সংগ্রহশালা করার দাবি তোলা হয়।

জমিদার ভিটে আজ বিক্রির মুখে

উল্লেখযোগ্য যে, সম্প্রতি এই বাড়িটি তাঁর বংশধরদের পক্ষ থেকে ব্যক্তিগতভাবে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। তাই নবগঠিত স্মৃতি রক্ষা কমিটি সরকারি স্তরে যোগাযোগ করে এই ঐতিহাসিক ভবনটিকে হেরিটেজ ঘোষণা ও সংগ্রহশালা করার উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে।

যে বাড়িতে ছিল চব্বিশ পরগনার প্রথম প্রত্ন সংগ্রহশালা

মজিলপুরের জমিদার দত্ত পরিবারের সন্তান কালিদাস দত্তের জীবন মোড় নেয় ১৯২৪ সালে, যখন তিনি রায়দিঘী থানাভুক্ত পশ্চিম জটা গ্রামে ঘন জঙ্গলের মধ্যে প্রায় ১০০ ফুট উঁচু উত্তর ভারতীয় রেখ দেউল ঘরানার একটি মন্দির দেখে অভিভূত হন। এই ঘটনা তাঁকে অবিভক্ত বাংলা তথা ভারতের অন্যতম সেরা অপেশাদার প্রত্নতত্ত্ববিদে পরিণত করে।

সুন্দরবনের দুর্গম অঞ্চলে যেখানে বাঘ, কুমির ও সাপের ভয়, রাস্তাঘাট ও সেতু ছিল না, সেই সময়ে ধনী জমিদার সন্তান হয়েও তিনি মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে বা নৌকা করে ঘুরে বেড়িয়েছেন। চাষির চালাঘরে রাত কাটিয়েছেন। এইভাবে তিনি আবিষ্কার করেন জৈন, বৌদ্ধ, হিন্দু মঠ-মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ, পোড়ামাটির ও পাথরের প্রত্নদ্রব্য, ধাতুর মূর্তি ও মুদ্রা। তাঁর অক্লান্ত প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ প্রমাণ হয় যে, সুন্দরবনেও ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের মতো প্রাচীন সভ্যতার গৌরবময় ঐতিহ্য বিদ্যমান ছিল।

এই প্রত্নসম্ভার স্বচক্ষে দেখতে তাঁর বাড়িতে এসেছিলেন ননীগোপাল মজুমদার, রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, সুনীতি চট্টোপাধ্যায়, দীনেশ চন্দ্র সেন, স্টেলা ক্রেমরিশ, নীহাররঞ্জন রায়, বিনয় ঘোষ সহ দেশ-বিদেশের বহু শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত।

ঐতিহাসিক গুরুত্ব

ঐতিহ্যবাহী এই ভবনের দ্বিতলের ফলকে দেখা যায়, ১৮৬৪ সালে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কিছুদিন এখানে ছিলেন এবং তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘বিষবৃক্ষ’-এর কিছু অংশ এখানেই রচনা করেছিলেন।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই বাড়িতেই গড়ে উঠেছিল অবিভক্ত চব্বিশ পরগনার প্রথম প্রত্ন সংগ্রহশালাটি। শুধুমাত্র জ্ঞানপিপাসু মনের নিবৃত্তি নয়, পরাধীন ভারতে দেশমাতা তথা জন্মভূমির গৌরব বৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষাও তাঁকে জীবনের চারটি দশক উৎসর্গ করতে অনুপ্রাণিত করেছিল। তাঁর দেখানো পথ ধরেই পরবর্তী প্রজন্ম ইতিহাস চর্চায় উদ্বুদ্ধ হয়, যার ফলস্বরূপ আজ দুই চব্বিশ পরগনায় ২০-৩০টি সংগ্রহশালা গড়ে উঠেছে।

স্মৃতিরক্ষা সমিতির সদস্যরা মনে করেন, সুন্দরবন তথা বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যপ্রেমীদের কাছে এই বাড়ি শুধু ইট-কাঠের সমাহার নয়, এক পবিত্র ঐতিহাসিক তীর্থক্ষেত্র। তাই এটিকে হেরিটেজ ঘোষণা করে সরকারি অধিগ্রহণ ও সংগ্রহশালা নির্মাণ করা অপরিহার্য।