প্রতিবাদী কণ্ঠ কি স্তব্ধ হবে? গুন্ডা দমন আইনের অপব্যবহারের আশঙ্কায় কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ মামলাকারী

পশ্চিমবঙ্গে অপরাধ দমনে রাজ্য সরকার প্রবর্তিত কঠোর ‘গুন্ডা দমন আইন’ (West Bengal Public Safety and Control of Anti-Social Activities Act) কার্যকর হওয়ার দিনই তা বড়সড় আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ল। সোমবার থেকে রাজ্যজুড়ে এই আইন কার্যকর হওয়ার পরেই এর স্থগিতাদেশ চেয়ে কলকাতা হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলা দায়েরের অনুমতি পেলেন আইনজীবী সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায়।
মামলার প্রেক্ষাপট:
রাজ্য সরকারের এই নতুন আইনের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে কলকাতা হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী ও বিচারপতি পার্থসারথী চট্টোপাধ্যায়ের ডিভিশন বেঞ্চে আবেদন জানান আইনজীবী সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায়। তিনি আদালতে সওয়াল করেন যে, এই আইনটি যেমন নিপীড়নমূলক, তেমনই তা ভারতীয় সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর বিরোধী। নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কায় তিনি এই আইনের ওপর অবিলম্বে স্থগিতাদেশ জারির আরজি জানান। আইনজীবীর এই আবেদনের প্রেক্ষিতে ডিভিশন বেঞ্চ মামলা দায়ের করার অনুমতি দিয়েছে। যদিও ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, আপাতত কোনো জরুরি ভিত্তিতে শুনানি হচ্ছে না; বরং আদালতের স্বাভাবিক কার্যতালিকা বা রোস্টার অনুযায়ী পরবর্তী সময়ে এই মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।
কী রয়েছে এই আইনে?
সমাজবিরোধী কার্যকলাপ, সংগঠিত অপরাধ এবং সিন্ডিকেট রাজ রুখতে রাজ্য সরকার বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে এই বিল পাশ করিয়েছিল। নতুন এই আইনের প্রধান কয়েকটি কড়া দিক হলো:
প্রিভেন্টিভ ডিটেনশন: যদি প্রশাসন বা পুলিশ মনে করে কোনো ব্যক্তি জননিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক, তবে তাকে কোনো বিচার প্রক্রিয়া ছাড়াই টানা এক বছর পর্যন্ত আটক রাখা যাবে।
নির্বাসন: অভিযুক্ত ব্যক্তিকে কোনো নির্দিষ্ট জেলা বা অঞ্চল থেকে এক বছর পর্যন্ত প্রবেশ নিষিদ্ধ করার বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে পুলিশকে।
সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত: অপরাধমূলক কার্যকলাপের মাধ্যমে অর্জিত সম্পত্তি কিংবা সরকারি-বেসরকারি সম্পত্তি নষ্ট করলে তা বাজেয়াপ্ত করার কঠোর বিধান রাখা হয়েছে এই আইনে।
বিতর্ক ও আশঙ্কার কারণ:
বিধানসভায় এই বিল পাশ হওয়ার পর থেকেই রাজ্যের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি এর তীব্র সমালোচনা করে আসছে। বিরোধীদের দাবি, অপরাধ দমনের আড়ালে রাজ্য সরকার মূলত বিরোধীদের রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করতে এই আইনকে ভবিষ্যতে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ, আন্দোলন কিংবা ভিন্ন মত দমনের জন্য এই আইনকে একটি ‘অস্ত্র’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং নাগরিক অধিকারের সুরক্ষার মধ্যে যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য থাকা প্রয়োজন, তা এই নতুন আইনের ফলে বিঘ্নিত হতে পারে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশ। এখন কলকাতা হাইকোর্টে দায়ের হওয়া এই জনস্বার্থ মামলার রায়ই ঠিক করবে যে, নতুন এই আইন তার প্রয়োগের জায়গা খুঁজে পাবে নাকি সংবিধানের দোহাই দিয়ে তা খারিজ হয়ে যাবে। আদালতের পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষায় এখন রাজ্য রাজনীতির নজর।