প্রতারণার ফাঁদ শেষ! এক ঝটকায় বন্ধ ৩ হাজারেরও বেশি ক্ষতিকর লোন অ্যাপ ও মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন

ডিজিটাল যুগে লাগামছাড়া সাইবার অপরাধ এবং অনলাইন আর্থিক প্রতারণা ঠেকাতে অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ করল কেন্দ্র সরকার। মঙ্গলবার লোকসভায় এক লিখিত জবাবে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, সাধারণ মানুষকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত দেশজুড়ে মোট ৩,৭১৮টি ক্ষতিকর ও প্রতারণামূলক মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন পাকাপাকিভাবে ব্লক বা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যার মধ্যে সাধারণ মানুষের মাথা ব্যথার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ানো একাধিক জাল লোন অ্যাপ বা ঋণদানকারী অ্যাপ্লিকেশনও রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে যেভাবে প্রযুক্তির অপব্যবহার করে সাধারণ নাগরিকের সর্বস্ব লুটে নেওয়া হচ্ছিল, তার বিরুদ্ধে এই মেগা পদক্ষেপকে অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে দেখছে ওয়াকিবহাল মহল।

বিজেপি সাংসদ পিসি মোহনের উত্থাপিত এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বন্দি সঞ্জয় কুমার বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরে জানিয়েছেন যে, ইনফরমেশন টেকনোলজি বা আইটি আইন, ২০০০-এর ৬৯(এ) এবং ৭৯(৩)(বি) ধারার আইনি ক্ষমতার বলে ইন্ডিয়ান সাইবারক্রাইম কো-অর্ডিনেশন সেন্টার বা I4C-এর নির্দেশিকা মেনেই এই বিপুল সংখ্যক অ্যাপ ব্লক করা হয়েছে। শুধু অ্যাপ বন্ধ করাই নয়, পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী সাইবার অপরাধে ব্যবহৃত ১৫ লক্ষেরও বেশি সন্দেহজনক সিম কার্ড এবং ৫ লক্ষের বেশি মোবাইল হ্যান্ডসেটের আইএমইআই (IMEI) নম্বরও ব্লক করে দেওয়া হয়েছে। সাইবার অপরাধীদের নেটওয়ার্ক ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে এই ডিজিটাল শাটডাউন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বলে মন্ত্রক সূত্রে জানানো হয়েছে।

সাইবার প্রতারণার শিকার হওয়া মানুষদের দ্রুত আর্থিক সুরক্ষা দিতে এবং খোয়া যাওয়া টাকা তৎক্ষণাৎ উদ্ধার করতে ২০২১ সালে চালু হওয়া ‘সিটিজেন ফিন্যান্সিয়াল সাইবার ফ্রড রিপোর্টিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ (CFCFRMS) বা I4C-এর পরিচালিত ব্যবস্থাটি কীভাবে জাদুকরি কাজ করছে, তাও মন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে। পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি জানান যে, ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত এই বিশেষ পোর্টালের মাধ্যমে প্রাপ্ত ৩২ লক্ষ ৮০ হাজারেরও বেশি অভিযোগের ভিত্তিতে নিখুঁত পদক্ষেপ করে অপরাধীদের হাত থেকে মোট ১১,১৫৮ কোটি টাকারও বেশি অর্থ সফলভাবে রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। ব্যাংকগুলির সহায়তায় ৩০ লক্ষেরও বেশি ‘সাসপেক্ট আইডেন্টিফায়ার’ এবং ৩২ লক্ষেরও বেশি ‘লেয়ার-১ মিউল অ্যাকাউন্ট’-এর স্পর্শকাতর তথ্য সংশ্লিষ্ট অংশীদার সংস্থাগুলির সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া হয়েছে। এর ফলে অপরাধীদের অ্যাকাউন্টে টাকা সরানোর আগেই প্রায় ২৫,৬৯৮ কোটি টাকার সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন মাঝপথেই আটকে বা প্রত্যাখ্যান করা সম্ভব হয়েছে।

শুধু প্রশাসনিক কড়াকড়ি বা প্রযুক্তিগত ব্লক করাই নয়, দেশের সাধারণ নাগরিক সাধারণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতেও কোমর বেঁধে নেমেছে কেন্দ্র। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে যে, সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘সাইবারদোস্ত’ (CyberDost) হ্যান্ডেলের ব্যাপক প্রচার, বিভিন্ন টিভি ও রেডিও চ্যানেল, এসএমএস এবং কলার টিউন ক্যাম্পেইন, সিনেমা হলের বিজ্ঞাপন, স্কুল স্তরে সচেতনতামূলক কর্মসূচি থেকে শুরু করে আইপিএল (IPL) ম্যাচের সময় প্রচার এবং রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির সহযোগিতায় বিশেষ ‘সাইবার নিরাপত্তা সচেতনতা সপ্তাহ’ পালনের মতো বহুমুখী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের এই বহুমুখী কৌশল দেশের সাইবার স্পেসকে আরও বেশি সুরক্ষিত ও নিরাপদ করে তুলবে বলেই মনে করা হচ্ছে।