প্রকাশের আগেই বাতিল সনিয়া গান্ধীর বহুল প্রতীক্ষিত আত্মজীবনী! বই ঘিরে রাজনীতিতে তুঙ্গে জল্পনা!

কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতি তথা দলের শীর্ষ নেত্রী সনিয়া গান্ধীর বহু-প্রতীক্ষিত এবং অত্যন্ত আলোচিত আত্মজীবনী ‘বিলংগিং: আ জার্নি অফ লাভ ইন ইন্ডিয়া’ (Belonging: A Journey of Love in India) শেষ পর্যন্ত প্রকাশ না করার এক বড় ও চাঞ্চল্যকর সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বনামধন্য প্রকাশক সংস্থা পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়া (PRHI)। চলতি বছরের শেষ নাগাদ বইটির বহুল প্রত্যাশিত সংস্করণ বাজারে আসার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তা ভেস্তে গেল। বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক ও সাহিত্য মহলে এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে তীব্র চর্চা শুরু হয়েছে।
প্রকাশক সূত্রে জানা গিয়েছে, এই জটিলতার মূল কারণ হল বইটির পাণ্ডুলিপির একটি নির্দিষ্ট অংশ। প্রকাশক সংস্থার পক্ষ থেকে ওই বিশেষ অংশে কিছু ‘সম্পাদনাগত পরিবর্তন এবং কিছু অংশ বাদ দেওয়ার’ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সনিয়া গান্ধী সেই শর্তে বা পরিবর্তনে সম্মত হননি। তাঁর স্পষ্ট আপত্তির পরেই এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয় প্রকাশক। উল্লেখ্য, পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউসের আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থা ‘আলফ্রেড এ নফ’ (Alfred A Knopf)-এর মাধ্যমে আগামী ১০ নভেম্বর আন্তর্জাতিক বাজারে এই স্মৃতিকথাটি আত্মপ্রকাশ করার কথা ছিল। নফ এর আগে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই জানিয়েছিল যে, বইটির প্রাথমিক সংস্করণে এক লক্ষ কপি ছাপানো হবে। তবে পিএইচআরআই এই প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়ানোর ঠিক পরেই আন্তর্জাতিক বাজারে বইটির প্রকাশ নিয়ে নতুন জল্পনা তৈরি হয়েছে। যদিও শোনা যাচ্ছে যে, ভারতে এই হাই-প্রোফাইল স্মৃতিকথাটি প্রকাশ এবং বিতরণের জন্য ইতিমধ্যেই অপর শীর্ষস্থানীয় প্রকাশনা সংস্থা হার্পারকলিন্স (HarperCollins)-এর সঙ্গে চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত হওয়ার পথে রয়েছে।
সনিয়া গান্ধীর এই একান্ত ব্যক্তিগত স্মৃতিকথামূলক বইটিতে যুদ্ধ-পরবর্তী ইতালির মাটিতে তাঁর শৈশব ও কৈশোরের দিনগুলি থেকে শুরু করে ভারতে আগমন, এবং প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর সঙ্গে বিবাহিত জীবনের এক দীর্ঘ রোমাঞ্চকর ও সংঘাতময় যাত্রাপথ অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি, ২০০৪ সালের ঐতিহাসিক লোকসভা নির্বাচনের পর কংগ্রেস-নেতৃত্বাধীন ‘ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স’ বা ইউপিএ জোট ক্ষমতায় আসার পরেও তিনি কেন প্রধানমন্ত্রীর পদ গ্রহণ না করে ত্যাগের পথ বেছে নিয়েছিলেন, সেই রাজনৈতিক রহস্য ও সিদ্ধান্তের নেপথ্য কারণও এই বইটিতে থাকতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বইটির বিষয়ে এর আগে নিজেই মুখ খুলেছিলেন সনিয়া গান্ধী। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমার পরিবারকে নিয়ে সংবাদমাধ্যমে ও জনসমক্ষে অনেক কিছুই লেখা হয়েছে, কিন্তু খুব কম লেখাই তাদের কাজের আসল উদ্দেশ্য, রাজনৈতিক কার্যকলাপ এবং এমনকী তাদের মানবিক দুর্বলতাগুলির প্রকৃত সত্য তুলে ধরতে পেরেছে। আমার এই আত্মজীবনী পাঠকদের এমন এক অনন্য ও অন্তরঙ্গ দৃষ্টিভঙ্গি দেবে, যার মাধ্যমে তারা গত ছয় দশক ধরে আমার চোখের সামনে ঘটে যাওয়া সামাজিক ও রাজনৈতিক রূপান্তরগুলি খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করতে পারবেন।’ তিনি এ কথাও অকপটে স্বীকার করেছেন যে, এই স্মৃতিকথা জনসমক্ষে আনার জন্য তাঁকে দশকের পর দশক ধরে অত্যন্ত যত্নে বজায় রাখা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার গণ্ডি থেকে সচেতনভাবেই বেরিয়ে আসতে হয়েছে। এই বইয়ের পাতায় উঠে এসেছে স্বামী রাজীব গান্ধীর মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের ঠিক পরবর্তী দিনগুলির ভয়াবহ মানসিক যন্ত্রণা এবং সংগ্রামের কথা।
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই ধরনের বিতর্কিত বা সংবেদনশীল স্মৃতিকথা আটকে যাওয়ার ঘটনা এই প্রথম নয়। চলতি বছরের শুরুর দিকে পেঙ্গুইন ইন্ডিয়া ঠিক একই কায়দায় প্রাক্তন সেনাপ্রধান জেনারেল এম এম নারাভানের বহুল আলোচিত স্মৃতিকথা প্রকাশের সিদ্ধান্ত মাঝপথে বাতিল করে দিয়েছিল। সেই সময় সংসদের অন্দরে রাহুল গান্ধী প্রাক্তন সেনাপ্রধানের লেখা ‘ফোর স্টারস অফ ডেস্টিনি’ (Four Stars of Destiny) বইটির একটি প্রতিলিপি প্রদর্শন করার পরই প্রকাশক আকস্মিক সিদ্ধান্ত বদল করে জানিয়েছিল যে তারা বইটি আর প্রকাশ করছে না। কারণ, সেই বইটিতে চিন সীমান্তে গালওয়ান সংঘাত এবং বিতর্কিত ‘অগ্নিপথ’ সামরিক নিয়োগ প্রকল্প সংক্রান্ত অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়গুলি খোলামেলাভাবে অন্তর্ভুক্ত ছিল। সবমিলিয়ে, সনিয়া গান্ধীর আত্মজীবনী প্রকাশ নিয়ে তৈরি হওয়া এই নতুন প্রশাসনিক ও প্রকাশনাগত জটিলতা আগামী দিনে রাজনৈতিক মহলে কতটা প্রভাব ফেলে, এখন সেটাই দেখার।