বইয়ের বাইরে গিয়ে ম্যাজিক! দিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবনে কোন অনন্য সম্মানে ভূষিত হতে চলেছেন গাজিয়াবাদের এই বাংলার শিক্ষক?

উত্তর প্রদেশের গাজিয়াবাদের একজন কৃতি সরকারি স্কুল শিক্ষিকা ডঃ রেনু ত্রিপাঠি তাঁর সম্পূর্ণ অভিনব ও জীবনমুখী শিক্ষাদান পদ্ধতির জন্য ছাত্রছাত্রীদের মাঝে আজ এক বিশেষ স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। বিগত ২৬ বছর ধরে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে শিক্ষা ক্ষেত্রে কর্মরত থেকে রেনু চলতি ২০২৬ সালের মর্যাদাপূর্ণ জাতীয় শিক্ষক পুরস্কারের জন্য চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। আগামী ৫ই সেপ্টেম্বর শিক্ষক দিবসের শুভ লগ্নে নয়াদিল্লিতে দেশের মহামহিম রাষ্ট্রপতি তাঁর হাতে এই অত্যন্ত সম্মানজনক পুরস্কার তুলে দেবেন। জানা গেছে, সারা দেশ থেকে এ বছর মাত্র আটচল্লিশ জন শিক্ষক এই পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন, যার মধ্যে গোটা উত্তর প্রদেশ থেকে মাত্র তিনজন এই গৌরব অর্জন করেছেন। আর আশ্চর্যের বিষয় হলো, গাজিয়াবাদ জেলা থেকে এই সর্বভারতীয় সম্মানের জন্য নির্বাচিত একমাত্র শিক্ষিকা হলেন এই রেনু ত্রিপাঠী। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য কেবল গতানুগতিক পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করা নয়, বরং শিশুদের সুশিক্ষিত ও আত্মনির্ভরশীল করে তোলা।

মূলত পিলখুয়ার স্থায়ী বাসিন্দা ডঃ রেনু ত্রিপাঠি ২০০৬ সাল থেকে বিজয় নগরের সরকারি গার্লস ইন্টার কলেজে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে বিজ্ঞান পড়াচ্ছেন। শিক্ষা ক্ষেত্রে তিনি তাঁর জীবনের প্রায় ২৬টি স্বর্ণালী বছর অতিবাহিত করেছেন। একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে এসেও রেনু প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে নিজের উচ্চশিক্ষা অব্যাহত রেখেছিলেন এবং একে একে এমএসসি, এম.এড., পিএইচডি ও এমএ-এর মতো বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন।

শিক্ষা ক্ষেত্রে তাঁর এই সুদীর্ঘ অবদান ইতোমধ্যেই অসংখ্য নামী-দামী পুরস্কারের মাধ্যমে জাতীয় স্তরে স্বীকৃত হয়েছে। তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের মর্যাদাপূর্ণ কৌটিল্য পুরস্কার, ভারতেন্দু হরিশচন্দ্র পুরস্কার এবং ওশান অ্যাওয়ার্ডের পাশাপাশি উত্তর প্রদেশ সরকারের আদর্শ শিক্ষক পুরস্কার ও শিক্ষণ-শিখন পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছেন। এর আগে ২০২২ সালে উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ তাঁকে স্বয়ং রাজ্য শিক্ষক পুরস্কারে সম্মানিত করেছিলেন।

বিজ্ঞান অধ্যয়নকে তিনি কখনই শুধু পাঠ্যবই বা চার দেওয়ালের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। ডঃ রেনু ত্রিপাঠী বিশ্বাস করেন যে, বিজ্ঞানকে কেবল বইয়ের পাতায় রেখে শিশুদের কার্যকরভাবে শেখানো সম্ভব নয়। এই উদ্ভাবনী ভাবনা থেকেই তিনি শিক্ষাকে অত্যন্ত সহজ, সরল ও ব্যবহারিক করে তোলার জন্য একাধিক সংক্ষিপ্ত শিক্ষণ মডিউল এবং টিএলএম (TLM) তৈরি করেছেন। ক্লাসরুমে ছাত্রছাত্রীদের বিষয়টি জলের মতো সহজ করে বোঝানোর জন্য তিনি স্মার্ট বোর্ড, আকর্ষণীয় পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশন এবং স্কুলের নিজস্ব উদ্ভিদ উদ্যানকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ব্যবহার করেন।

তাঁর কাছে জীবনের সবচেয়ে বড় তৃপ্তি বা সুখ হলো তাঁর পড়ানো ছাত্রছাত্রীদের বড় হয়ে সাফল্যের শিখরে পৌঁছাতে দেখা। তাঁরই এক গরিব ছাত্র, যে অত্যন্ত অসচ্ছল পরিবার থেকে উঠে এসেছিল, সে আজ পুনেতে ডিজিটাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো উচ্চপদে সুনামের সঙ্গে কাজ করছে। এছাড়া এক সাধারণ দর্জি পরিবারের চার বোনকেও তিনি সঠিক দিশা দেখিয়ে আজ সরকারি চাকরিতে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

আগামী ২০২৭ সালের জুলাই মাসে রেনুর সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের কথা রয়েছে, কিন্তু শিক্ষাক্ষেত্রের সঙ্গে তাঁর আজীবনের এই গভীর সম্পৃক্ততা ছেড়ে দেওয়ার বিন্দুমাত্র কোনো ইচ্ছা তাঁর নেই। অবসরের পরেও তিনি দেশের সুবিধাবঞ্চিত ও অবহেলিত শিশুদের নিখরচায় শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে একটি নিজস্ব বেসরকারি সংস্থা বা এনজিও শুরু করতে চান। জাতীয় শিক্ষক পুরস্কারের জন্য তাঁর নাম ঘোষিত হওয়ায় তিনি ভারত সরকারের পাশাপাশি তাঁর নিজের পরিবার ও শ্বশুরবাড়ির প্রতিটি সদস্যের অকৃত্রিম সমর্থনের জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।

এদিকে স্কুলের অধ্যক্ষও তাঁকে পুরো প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত গর্ব বলে অভিহিত করেছেন। ডঃ রেনু ত্রিপাঠীর কাছে এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারটি কেবল কোনো ব্যক্তিগত সম্মান বা প্রাপ্তি নয়, বরং দেশের প্রতিটি শিশুকে শিক্ষিত ও ক্ষমতায়িত করার তাঁর দীর্ঘ সংগ্রাম ও নিরলস প্রচেষ্টারই এক অভাবনীয় স্বীকৃতি।