পেট্রোলের দাম কি এবার কমবে? গভীর সমুদ্রে বিশাল তেল ভাণ্ডারের খোঁজে মেগা প্রজেক্টের ঘোষণা মোদী সরকারের

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন সংকটের আবহে ভারতের энергети (এনার্জি) নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে কেন্দ্র। বর্তমানে ভারত তার জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৮৯ শতাংশের জন্য বিদেশের ওপর নির্ভরশীল। এই বৈদেশিক নির্ভরতা কমাতে এবং দেশের অর্থনীতিকে সুসংহত করতে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় একটি মেগা প্রজেক্টকে সবুজ সঙ্কেত দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণবের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা অনুযায়ী, ৮,৪৮৪ কোটি টাকার ‘ন্যাশনাল অফশোর এক্সপ্লোরেশন স্কিম’ বা ‘সমুদ্র मंथন’ প্রজেক্টের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করতে চলেছে।

তেল বা গ্যাস অনুসন্ধান করা কোনো সাধারণ কাজ নয়, এটি অত্যন্ত প্রযুক্তিগত ও বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া। সরকারের এই ৮,৪৮৪ কোটি টাকার বিশাল বাজেটকে মূলত দুটি বড় অংশে ভাগ করা হয়েছে। যার প্রথম ধাপে প্রায় ২৮,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে সমুদ্রের তলদেশের সিসমিক ডেটা (Seismic Data) সংগ্রহের জন্য, যার মাধ্যমে আধুনিক জাহাজের সাহায্যে সমুদ্রের অতি গভীরে তরঙ্গ পাঠিয়ে পাথরের নিচে লুকিয়ে থাকা জ্বালানির হদিশ মাপা হবে। দ্বিতীয় ও প্রধান ধাপে প্রায় ৪৩,২০০ কোটি টাকা খরচ করা হবে ড্রিলিং মেশিন ও উৎপাদন পরিকাঠামো গড়ে তোলার পেছনে। ভারত সরকারের লক্ষ্য, আগামী ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে দেশের জলসীমার সম্পূর্ণ সামুদ্রিক মানচিত্র তৈরি করে ফেলা।

এই প্রজেক্টের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো ওএনজিসি (ONGC)-র আগামী দিনে ১৫০টি অতি গভীর জলের কুয়ো বা ডি-ওয়াটার ওয়েল খননের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা। একেকটি গভীর কুয়ো খননে প্রায় ৫০০ থেকে ১০০০ কোটি টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। ফলস্বরূপ, হাজার হাজার কোটি টাকার এই বিশাল বিনিয়োগ থেকে প্রায় ৬০০ মিলিয়ন মেট্রিক টন তেল বা সমতুল্য সম্পদ পাওয়ার আশা করা হচ্ছে। হাজার হাজার ফুট গভীরে, যেখানে প্রচণ্ড জলের চাপে লোহাও কুঁকড়ে যেতে পারে, সেখানে নিখুঁতভাবে ড্রিলিং বিট পরিচালনা করে তেলের সন্ধান চালানো ভারতীয় প্রকৌশলীদের অসামান্য দক্ষতারই পরিচায়ক।

বর্তমানে ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম কাঁচা তেল আমদানিকারক দেশ। বিদেশ থেকে তেল কিনতে গিয়ে আমাদের দেশের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বা ফরেক্স রিজার্ভ জলের মতো খরচ হয়ে যায়। ‘সমুদ্র मंथন’ প্রকল্পের হাত ধরে যদি দেশীয় উৎস থেকে তেলের জোগান নিশ্চিত করা যায়, তবে ভারতের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। এর ফলে মার্কিন ডলারের সাপেক্ষে ভারতীয় টাকা আরও শক্তিশালী হবে এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানিকারক দেশগুলির ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা অনেকটাই কমে আসবে। এই মিশনটি শুধুমাত্র অর্থনৈতিক দিক থেকেই নয়, বরং ভারতের ভূ-কৌশলগত ও সামুদ্রিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও এক বিরাট মাইলফলক হতে চলেছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে ভারত তার মোট তেল আমদানির প্রায় অর্ধেক বা তার বেশি অংশ রাশিয়া থেকেই সংগ্রহ করছে। চলতি বছরের জুলাই মাসে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের কাঁচা তেল আমদানি রেকর্ড গড়ে প্রতিদিন প্রায় ২৭.৮ লক্ষ ব্যারেলে গিয়ে ঠেকেছে, যা মোট আমদানির ৫৫ শতাংশের বেশি। এর পাশাপাশি ইরাক, সৌদি আরব, আমেরিকা এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর মতো ঐতিহ্যবাহী দেশগুলি থেকেও তেল আমদানি অব্যাহত রয়েছে। তা সত্ত্বেও, প্রতি বছর জ্বালানি আমদানির পেছনে ভারতের প্রায় ১৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ হয়। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশবাসীর করের টাকা যা বিদেশে চলে যাচ্ছে। তাই ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও এই বিশাল বিনিয়োগ ভারতের অর্থনীতিকে এক নতুন গতি দেবে এবং দেশকে আত্মনির্ভর করে তুলবে।