পেট্রলে ইথানল মেশানো নিয়ে বিস্ফোরক দাবি! পুরনো গাড়ির জন্য কি ফের ফিরছে E10 পেট্রল?

পেট্রলে ইথানল মেশানোর মাত্রা নিয়ে চলা তীব্র বিতর্কের মধ্যেই পুরনো দু’চাকার গাড়ির জন্য ফের E10 পেট্রল চালুর জোরালো সওয়াল করলেন দেশের মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ভি অনন্ত নাগেশ্বরন। একই সঙ্গে, E20 জ্বালানির পর ইথানলের মিশ্রণ আরও বাড়ানোর আগে খাদ্য বনাম জ্বালানি এবং জল ব্যবহারের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়গুলো নতুন করে গভীরভাবে বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
এক বেসরকারি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টা নাগেশ্বরন এবং অর্থমন্ত্রকের অর্থনৈতিক বিষয়ক দফতরের পরামর্শদাতা আকাশ পুজারি এই চাঞ্চল্যকর মত প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, E20 নীতি নিয়ে বিতর্ক কেবল পুরনো গাড়ির ইঞ্জিনের ক্ষয়ক্ষতি বা মাইলেজ কমে যাওয়ার মতো সাধারণ সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ভবিষ্যতে যদি E27 বা E30-এর মতো উচ্চ মাত্রার মিশ্রণ চালু করা হয়, তবে তার সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে দেশের কৃষি ব্যবস্থা, উর্বর জমি এবং মূল্যবান জল সম্পদের উপর।
বর্তমানে ভারতে E20 পেট্রল নীতির আওতায় পেট্রলের সঙ্গে ২০ শতাংশ পর্যন্ত ইথানল মেশানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই ইথানল তৈরির কাজে আখের পাশাপাশি ভুট্টা, চাল এবং অন্যান্য খাদ্যশস্য ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলস্বরূপ, জ্বালানির চাহিদা মাত্রাতিরিক্তভাবে বৃদ্ধি পেলে একই ফসলের জন্য মানবজাতির খাদ্য, পশুখাদ্য এবং জ্বালানি উৎপাদন—এই তিন প্রধান ক্ষেত্রের মধ্যে এক তীব্র প্রতিযোগিতাও অনিবার্যভাবে বেড়ে যাবে।
বিশেষ করে ভুট্টার ক্রমবর্ধমান ব্যবহারের প্রসঙ্গ জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন দুই শীর্ষ বিশ্লেষক। ইথানল উৎপাদনে যদি ভুট্টার ব্যবহার এভাবে বাড়তেই থাকে, তবে দেশের পশু ও পোলট্রি খাদ্যের জন্য তার প্রয়োজনীয় জোগান মারাত্মকভাবে হ্রাস পেতে পারে। সেক্ষেত্রে বাজারে পোলট্রি ফিড থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর দাম আকাশছোঁয়া হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হবে। তাঁদের মতে, E20 থেকে আরও বেশি মিশ্রণের পথে নিঃশর্তভাবে পা বাড়ানোর আগে এই সমস্ত পরোক্ষ এবং লুকানো খরচ হিসাবের খাতার মধ্যে রাখা অত্যন্ত জরুরি।
এর পাশাপাশি উঠে এসেছে দেশের জল সংকটের অত্যন্ত গুরুতর প্রশ্ন। আখের মতো অতিমাত্রায় জলনির্ভর ফসলের ক্ষেত্রে জ্বালানি উৎপাদনের কাজে ব্যবহৃত জলের মোট পরিমাণও চুলচেরা বিবেচনায় আনার কথা বলা হয়েছে। কৃষিজমি এবং জলের ব্যবহার একবার জ্বালানি উৎপাদনের দিকে পুরোপুরি ঘুরে গেলে, পরবর্তীতে সেই নীতিগত সিদ্ধান্ত রাতারাতি বদলানো সরকারের পক্ষে খুব একটা সহজ নাও হতে পারে।
তবে এই মুহূর্তে তাঁদের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক এবং বাস্তবসম্মত প্রস্তাবটি হল পুরনো যানবাহনগুলোকে নিয়ে। পরিবেশ সংক্রান্ত নিয়ম চালুর আগের প্রায় সাড়ে সাত থেকে আট কোটি কার্বুরেটর-নির্ভর দু’চাকার গাড়ি আজও ভারতের রাস্তায় চলাচল করছে বলে তাঁরা উল্লেখ করেছেন। তাঁদের মতে, পুরনো দিনের এই কার্বুরেটরগুলো বেশি মাত্রায় ইথানল মিশ্রিত জ্বালানির সঙ্গে প্রয়োজনীয়ভাবে জ্বালানি ও বায়ুর সঠিক অনুপাত সামঞ্জস্য করতে সম্পূর্ণ অক্ষম। ফলস্বরূপ, ইঞ্জিনের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার চরম ঝুঁকি থাকে। তাছাড়া, পুরনো রাবার নির্মিত যন্ত্রাংশগুলোও অতিরিক্ত ইথানলের ক্ষয়ক্ষতি সহ্য করার জন্য উপযুক্ত নয়।
এই সমস্ত প্রযুক্তিগত সমস্যার কথা মাথায় রেখে, পুরনো গাড়ির জন্য নির্দিষ্টভাবে E10 এবং তুলনামূলকভাবে নতুন প্রজন্মের গাড়ির জন্য E20—এই দুই ভিন্ন ধরনের জ্বালানি বাজারে চালু রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন তাঁরা। যদিও সরকারের বর্তমান নীতি সম্পূর্ণভাবে E20-এর পক্ষেই অবস্থান করছে। ব্যাপক ল্যাবরেটরি পরীক্ষার পরই E20 জ্বালানি সম্পূর্ণ নিরাপদ বলে কেন্দ্রের তরফে বারবার জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে, এখনই E20-এর মাত্রা ছাড়িয়ে আরও উর্ধ্বে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত নেই বলেও স্পষ্ট করা হয়েছে।
নাগেশ্বরন এবং পুজারিদের সামগ্রিক বক্তব্য হল, সবুজ জ্বালানির উদ্দেশ্যে ইথানল নীতির কিছু সুনির্দিষ্ট বাণিজ্যিক লাভ অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু তার পাশাপাশি জমিতে ঠিক কী ধরনের ফসল চাষ হবে, কতখানি মূল্যবান জমি ও জল জ্বালানি তৈরির পেছনে খরচ হবে এবং পরিশেষে দেশের সামগ্রিক খাদ্য উৎপাদনে তার ঠিক কী ধরনের মারাত্মক প্রভাব পড়বে, সেই নিখুঁত হিসাব কষা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।