সিনেমার রুপোলী পর্দার টানটান অ্যাকশন দৃশ্যকেও হার মানাবে বাস্তবের এই রাজনৈতিক থ্রিলার। পুলিশ বাড়ির সদর দরজায় কড়া নাড়তেই একেবারে নাটকীয় কায়দায় বাগানবাড়ির পিছনের জানালা টপকে, খালি পায়ে চম্পট দিলেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিষ্ণুপুরের দাপুটে তৃণমূল বিধায়ক দিলীপ মণ্ডল। সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়া সেই পালানোর দৃশ্য এখন নেটদুনিয়ায় হু হু করে ভাইরাল। শুধু তাই নয়, পাঁচিল টপকে পালাতে গিয়ে ছিঁড়ে যায় বিধায়কের পরনের পাজামাও। এরপর পুলিশের চোখে ধুলো দিতে এবং নিজের পরিচয় লুকাতে একের পর এক ছদ্মবেশ ধারণ করেন তিনি। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বর্তমানে রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র শোরগোল পড়ে গিয়েছে।
তদন্তকারী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, গত বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই বিতর্ক তাড়া করছিল দিলীপ বাবুকে। সম্প্রতি বিজেপির উদ্দেশে অত্যন্ত কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল তাঁর বিরুদ্ধে। একটি জনসভায় তাঁকে বলতে শোনা গিয়েছিল, “তোদের যে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছে, তাঁকে জিজ্ঞেস করে দেখবি দিলীপ মণ্ডল কে?” এই চরম বিতর্কিত মন্তব্যের পরই নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। ওই ভাইরাল বিবৃতির জেরে তৃণমূল বিধায়কের বিরুদ্ধে একাধিক জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা (FIR) রুজু করে পুলিশ। সেই মামলার ভিত্তিতেই বৃহস্পতিবার সকালে ডায়মন্ড হারবার জেলা পুলিশের একটি বিশাল টিম পৈলানে অবস্থিত বিধায়কের বিলাসবহুল বাগানবাড়িতে হানা দেয়।
পুলিশের গাড়ি এলাকায় ঢুকতেই গোপন সূত্রে সেই খবর পৌঁছে যায় বিধায়কের কানে। আর তাতেই ঘটে যায় বিপত্তি। সিসিটিভি ফুটেজের টাইমস্ট্যাম্প অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকাল ঠিক ৯টা ৪ মিনিট ৫৪ সেকেন্ড নাগাদ যখন পুলিশ বাড়ির মূল ফটক দিয়ে ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই পরনের সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি সামলে বাড়ির পিছনের জানলা গলে বাইরে লাফিয়ে পড়েন দিলীপ মণ্ডল। হুড়োহুড়ি করে পালাতে গিয়ে পাঁচিলের কোণায় লেগে ছিঁড়ে যায় তাঁর পাজামা। জুতো পরারও সময় পাননি তিনি। সিসিটিভিতে স্পষ্ট দেখা গিয়েছে, পাজামা উঁচিয়ে খালি পায়েই তীব্র গতিতে দৌড়চ্ছেন বিষ্ণুপুরের এই বিদায়ী জনপ্রতিনিধি।
পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে এরপর শুরু হয় বিধায়কের নিখুঁত ‘অপারেশন ছদ্মবেশ’। পুলিশ যাতে সহজে তাঁকে চিনতে না পারে, তার জন্য এলাকা থেকেই এক পরিচিত ব্যক্তির কাছ থেকে একটি আকাশি রঙের সাধারণ টি-শার্ট জোগাড় করে পরে নেন তিনি। বদলে ফেলেন নিজের চিরপরিচিত পাজামা-পাঞ্জাবির রাজনৈতিক পোশাক। এরপর পুলিশি ঘেরাটোপ এড়াতে কোনো প্রধান রাস্তা ব্যবহার না করে, একটি নির্মীয়মাণ বহুতলের পাশ দিয়ে, নোংরা ড্রেন, জলাজমি এবং কাদাভর্তি মাঠ পেরিয়ে ডায়মন্ড হারবার রোডের দিকে এগোতে থাকেন তিনি। মাঝপথে এক স্থানীয় বাসিন্দা বিধায়ককে খালি পায়ে ও রক্তাক্ত অবস্থায় ছুটতে দেখে দয়াপরবেশ হয়ে নিজের চটি জোড়া এগিয়ে দেন। সেই চটি পরেই এলাকা ছাড়েন তিনি।
বর্তমানে পলাতক বিধায়কের পুরো পালানোর রুট ম্যাপ সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে খতিয়ে দেখছে পুলিশ। তাঁর মোবাইল টাওয়ার লোকেশন ট্র্যাক করে বিভিন্ন সম্ভাব্য ডেরায় তল্লাশি চালানো হচ্ছে। তবে শারীরিকভাবে পলাতক থাকলেও, সোশ্যাল মিডিয়ায় এখনও সমানভাবে সক্রিয় রয়েছেন এই তৃণমূল নেতা। ফেসবুক পোস্টে তিনি দাবি করেছেন, “আমার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক একাধিক মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। আমি আইনের ওপর আস্থাশীল।” তবে আইনের শাসন যতই থাকুক, দাপুটে বিধায়কের এই ‘খালি পায়ে জানলা টপকে’ পালানোর ঘটনা ডেইলিয়ান্ট-এর পাঠকদের মধ্যে বিনোদনের পাশাপাশি ব্যাপক রাজনৈতিক চর্চার খোরাক জুগিয়েছে।





