অন্নপূর্ণা যোজনার ৩০০০ টাকা আসতেই বাংলার ঘরে ঘরে গৃহযুদ্ধ! শাশুড়ি-বৌমার দন্দ্বে তোলপাড় পাড়া-পড়া

রান্নাঘরের যাবতীয় কাজ সেরে সন্ধ্যার আড্ডায় প্রিয় সিরিয়াল দেখা—এমনই ছিমছাম ও সহজ-সরল মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতেও এবার হঠাৎ নেমে এসেছে চাপা উত্তেজনা ও অশান্তির কালো মেঘ। এর মূল কারণ আর কিছুই নয়, রাজ্য সরকারের জনপ্রিয় সামাজিক প্রকল্প ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’-র ৩,০০০ টাকার আর্থিক সহায়তা। চলতি মাসের মাঝামাঝি অর্থাৎ ১৭ আগস্ট থেকে রাজ্য সরকার যখন উপভোক্তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে এই টাকা পাঠানো শুরু করেছে, ঠিক তখনই সেই টাকা প্রাপ্তি ঘিরে রাজ্যের বহু পরিবারে শুরু হয়েছে নজিরবিহীন টানাপোড়েন ও গৃহযুদ্ধ।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, একই পরিবারের একাধিক মহিলা সদস্য অন্নপূর্ণা যোজনার জন্য আবেদন করলেও সকলের অ্যাকাউন্টে একসঙ্গে টাকা ঢোকেনি। কোথাও দেখা যাচ্ছে পরিবারের কোনো এক সদস্যের টাকা ঢুকেছে তো অন্যজনের আবেদন এখনও ‘আন্ডার প্রসেস’ বা প্রক্রিয়াধীন অবস্থায় আটকে রয়েছে। আর এই বৈষম্য থেকেই বাংলার ঘরে ঘরে শুরু হয়েছে পারিবারিক কোন্দল। বহু বাড়িতে বউমার অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকে গেলেও শাশুড়ির আবেদন আটকে থাকায় মন খারাপ হচ্ছে প্রবীণ সদস্যদের। আবার কোথাও ঠিক উল্টো ঘটনাও ঘটছে। ছোটখাটো এই মনকষাকষি ও পারিবারিক অশান্তি এখন ধীরে ধীরে বড় আকার ধারণ করছে বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল।
বিশেষ করে উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বারাসত, হাবড়া, দেগঙ্গা, বসিরহাট এবং দত্তপুকুরের মতো বিভিন্ন ব্লকে এই ধরনের ঘটনার ছবি আকছার চোখে পড়ছে। দত্তপুকুরের এক পরিবারের বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, শাশুড়ির অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকে গেলেও নিজে হাতে ফর্ম পূরণ করে দেওয়া সত্ত্বেও বউমার আবেদন এখনও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। অন্যদিকে, অশোকনগরের একটি পরিবারে বউমার টাকা মিললেও শাশুড়ির আবেদনের পাশে লেখা রয়েছে ‘ফর ফারদার ভেরিফিকেশন’ এবং ‘আন্ডার এনকোয়ারি গভর্নমেন্ট এমপ্লয়ি’। ফলে স্বাভাবিকভাবেই দুই প্রজন্মের মধ্যে তৈরি হয়েছে তীব্র ধন্দ ও অশান্তি।
টাকা কেন অ্যাকাউন্টে ঢুকল না বা কেনই বা আবেদন আটকে রইল, তার সঠিক উত্তর পেতে ভুক্তভোগী মহিলারা সটান ছুটছেন স্থানীয় ব্লক অফিসগুলিতে। হাজার হাজার মহিলার এই ভিড় সামলাতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে সরকারি আধিকারিকদের। অনেক জায়গায় আবার ক্ষোভ উগরে দিয়ে বিক্ষোভ দেখাতেও শুরু করেছেন সাধারণ মানুষ।
জনরোষ ও প্রশাসনিক জটিলতার মাঝে রাজ্য প্রশাসনের কর্তারা অবশ্য শান্ত থাকার বার্তা দিয়েছেন। প্রশাসনের সাফাই দিয়ে জানানো হয়েছে, ‘প্রক্রিয়াধীন’ কথাটির অর্থ এই নয় যে আবেদন বাতিল হয়ে গেছে। সমস্ত নথি, তথ্য এবং যোগ্যতা নিখুঁতভাবে যাচাই করার প্রক্রিয়া শেষ হলেই তবেই চূড়ান্তভাবে টাকা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে। তাই সামান্য সময় লাগাটা একেবারেই স্বাভাবিক। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে হাসিমুখেই এক প্রশাসনিক কর্তা মন্তব্য করেছেন, অন্নপূর্ণা যোজনা যেন ঘরে ঘরে একপ্রকার ‘গৃহযুদ্ধ’ বাধিয়ে দিয়েছে। তবে দ্রুত সমস্ত ত্রুটি সংশোধন করে যোগ্য আবেদনকারী প্রতিটি মহিলাকে এই প্রকল্পের আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে বলে আশ্বস্ত করেছে প্রশাসন।