নীল ড্রাম থেকে সোজা সাপের বিষ! স্বামীর খুনে অভিযুক্ত দুই মোস্ট ওয়ান্টেড মহিলা এবার একই জেলের এক ছাদের তলায়

উত্তরপ্রদেশের অপরাধের মানচিত্রে মিরাটের চৌধুরী চরণ সিং জেলা কারাগার আবারও সমগ্র দেশের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। স্বামী হত্যার অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও রোমহর্ষক দুটি পৃথক ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত দুই কুখ্যাত মহিলাকে এবার একই সংশোধনাগারের ভেতরে রাখা হয়েছে। এর আগে দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী মিরাটের ভয়াবহ ‘নীল ড্রাম হত্যা মামলা’র মূল অভিযুক্ত মুসকান ইতিমধ্যেই এই কারাগারের চার দেওয়ালের মধ্যে বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন। আর এবার সেই একই জেলের সেলে যোগ দিয়েছেন হস্তিনাপুরের বহুল আলোচিত ‘সর্প হত্যা মামলা’র অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত দামিনী। অপরাধের ধরন আলাদা হলেও এই দুটি মামলার মূল অভিযোগের নেপথ্যে রয়েছে এক চাঞ্চল্যকর অভিন্ন সমীকরণ— যেখানে অভিযোগ উঠেছে যে অভিযুক্ত মহিলারা তাদের নিজ নিজ স্বামীকে ঠান্ডা মাথায় খুন করার জন্য নিজেদের পরকীয়া প্রেমিকদের সঙ্গে যৌথভাবে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল।

দেশজুড়ে ব্যাপক শোরগোল ফেলে দেওয়া মিরাটের সেই মর্মান্তিক ‘নীল ড্রাম হত্যাকাণ্ড’ একসময় সমগ্র দেশকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল। পুলিশি তদন্তে বেরিয়ে আসে যে, প্রধান অভিযুক্ত মুসকান তার গোপন প্রেমিকের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সুপরিকল্পিতভাবে তার স্বামী সৌরভকে নির্মমভাবে হত্যা করে। নৃশংস সেই হত্যাকাণ্ডের পর প্রমান লোপাট করার অসৎ উদ্দেশ্যে মৃতদেহের টুকরো বা আস্ত দেহটি লুকিয়ে ফেলার জন্য একটি বিশাল মাপের নীল রঙের প্লাস্টিকের ড্রামের মধ্যে ভরে রাখা হয়েছিল। লোমহর্ষক এই ঘটনাটি সর্বসমক্ষে প্রকাশ পাওয়ার পর থেকেই মামলাটি জাতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রধান শিরোনামে পরিণত হয় এবং সাধারণ মানুষের মনে গভীর আতঙ্কের সৃষ্টি করে।

পুলিশের বিশেষ দল দ্রুত অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত মুসকানকে গ্রেপ্তার করে এবং আদালতের নির্দেশে তাকে মিরাটের চৌধুরী চরণ সিং জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। সেই সময় থেকেই সে ওই জেলের মহিলা ওয়ার্ডে বন্দি রয়েছে। আর এবার ঠিক তার সঙ্গেই স্বামী হত্যার অপর এক অত্যন্ত জটিল ও আলোচিত মামলায় অভিযুক্ত দামিনীকেও একই কারাগারে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, বিচার প্রক্রিয়ার স্বার্থে এবং মামলার পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের জন্য এই দুই হাই-প্রোফাইল অভিযুক্তকে একই সংশোধনাগারের কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টনীতে রাখা হয়েছে।

মিরাটেরই হস্তিনাপুর থানা এলাকার অন্তর্গত এলাকায় ঘটে যাওয়া আরও একটি রহস্যজনক ঘটনা সাধারণ মানুষকে রীতিমতো হতবাক করে দিয়েছে। পুলিশের চার্জশিট অনুযায়ী, দামিনী তার প্রেমিক তুষারের সঙ্গে গভীর প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে এবং তাকে পাওয়ার জন্যই নিজের স্বামী অতুল পাওয়ারকে চিরতরে রাস্তা থেকে সরানোর ছক কষে। তদন্তে যে তথ্য সামনে এসেছে তা রীতিমতো সিনেমার গল্পকেও হার মানায়; অভিযোগ উঠেছে যে, নিরীহ স্বামীকে হত্যা করার জন্য কোনো প্রচলিত ধারালো অস্ত্র বা বিষ নয়, বরং একটি বিষাক্ত সাপ ব্যবহার করা হয়েছিল। দামিনী অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় একজন পেশাদার সাপুড়ের কাছ থেকে একটি বিষাক্ত সাপ কিনে আনে এবং গভীর রাতে ঘুমন্ত স্বামীকে সেই সাপের কামড় খাইয়ে অত্যন্ত সুকৌশলে তার মর্মান্তিক মৃত্যু নিশ্চিত করে। এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটিত হওয়ার পর পুলিশ দামিনীকে গ্রেপ্তার করে এবং বর্তমানে আদালতের নির্দেশে সেও মিরাটের চৌধুরী চরণ সিং জেলা কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দি জীবন কাটাচ্ছে।

তবে শুধু মুসকান বা দামিনীই নয়, বিগত কয়েক বছরের অপরাধের পরিসংখ্যান খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে যে স্বামী হত্যার গুরুতর অভিযোগে মিরাটের এই নির্দিষ্ট জেলা কারাগারে একাধিক মহিলা বন্দি রয়েছে। এর প্রায় ১৬ মাস আগে মিরাটেরই বাহসুমা থানা এলাকায় ঠিক এই ধরনেরই আরেকটি শিহরণ জাগানো ঘটনা ঘটেছিল। সেই সময় ববিতা নামক এক মহিলার বিরুদ্ধে সুচতুরভাবে সাপের কামড় খাইয়ে নিজ স্বামীকে হত্যার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছিল। সেই মামলাতেও আইনি প্রক্রিয়া মেনে অভিযুক্ত ববিতাকে চৌধুরী চরণ সিং জেলা কারাগারে বন্দি করা হয়েছিল। কারা প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এই জেলা কারাগারে স্বামী হত্যার মতো স্পর্শকাতর ও গুরুতর অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত একাধিক নারী বন্দি একে অপরের পাশাপাশি সেলে দিন কাটাচ্ছেন। আর এবার সেই অপরাধের তালিকায় দামিনীর নাম যুক্ত হওয়ায় কারাগারের অন্দরে এবং বাইরে নতুন করে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে।

সমাজতত্ত্ববিদ ও অপরাধবিজ্ঞানীদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে দাম্পত্য সম্পর্কের পবিত্রতা নষ্ট হওয়া এবং বিশ্বাসের চরম অবক্ষয়ের জেরে এই ধরনের ঠান্ডা মাথার খুনের ঘটনা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায় সমাজের সর্বস্তরে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিগত কয়েক বছরে মিরাট এবং তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে যতগুলি এই ধরনের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সামনে এসেছে, তার প্রায় প্রতিটির নেপথ্যেই প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে বিবাহবহির্ভূত অবৈধ প্রেমের সম্পর্ক। অপরাধের এই ক্রমবর্ধমান প্রবণতা রোধে পুলিশ ও প্রশাসন অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং সংগৃহীত বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে প্রতিটি মামলায় অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।