নেই রাস্তা, নেই নদী! সরকারি অবহেলায় লাখ লাখ টাকা খরচ করে তৈরি সেতু এখন শুধুই শো-পিস

বিহারের সেতু নির্মাণ, সেগুলোর আকস্মিক ধসে পড়া এবং অদ্ভুত সব নকশা নিয়ে রাজ্যজুড়ে প্রায়শই নানা চাঞ্চল্যকর ও কৌতূহলব্যঞ্জক ঘটনা সামনে আসে। কখনও উদ্বোধনের আগেই আস্ত সেতু ভেঙে নদীর জলে তলিয়ে যায়, আবার কখনও নদী, জল বা রাস্তার কোনো নামগন্ধ না থাকা সত্ত্বেও ফাঁকা মাঠের মাঝখানে আস্ত সেতু নির্মাণ করে তাক লাগিয়ে দেওয়া হয়। সরকারি উদাসীনতা, চরম দূরদর্শিতার অভাব এবং প্রশাসনিক অবহেলার এমনই এক বাস্তব ও মর্মান্তিক উদাহরণ ফের নজরে এসেছে পূর্ব চম্পারণ তথা মোতিহারি জেলায়। দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগীয় আধিকারিকদের চরম দূরদর্শিতার অভাবে লক্ষ লক্ষ টাকার সরকারি অনুদানে নির্মিত এই সেতুটি বর্তমানে কোনো কাজে না এসে কেবল একটি নিছক প্রদর্শনী বস্তু বা শো-পিসে পরিণত হয়েছে।
বিহারের এই মোতিহারি জেলা থেকেই মূলত সেতু নির্মাণের দুটি সম্পূর্ণ আলাদা এবং অদ্ভুত চিত্র জনসমক্ষে এসেছে। একদিকে জেলার কেশরিয়া ব্লকে, আশেপাশের এলাকায় কোনো নদী, জলাশয় বা জনবসতিপূর্ণ গ্রাম না থাকায় একটি আস্ত সেতু সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত এবং অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। অন্যদিকে, পাতাহি ব্লকের বেতৌনা গ্রামে একটি সেতু নির্মাণ করা হলেও সেটি এলাকার মূল সড়কের সঙ্গে কোনোভাবেই সংযুক্ত হতে ব্যর্থ হয়েছে। এলাকাবাসীর জমি প্রদানের পরেও সংযোগ সড়কটি অসম্পূর্ণ থেকে যাওয়ায় এই চরম পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
বেতৌনার ননিয়া টোলি গ্রামের ভুক্তভোগী গ্রামবাসীদের বেদনাদায়ক কাহিনী এবং বিভাগীয় গাফিলতির এক পূর্ণাঙ্গ বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো। ননিয়া টোলি গ্রামের সাধারণ মানুষ তৎকালীন স্থানীয় বিধায়কের কাছে এলাকার একটি বহু পুরনো ফুটপাথের ওপর পারাপারের সুবিধার জন্য একটি সেতু নির্মাণের বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছিলেন। সেই আর্জি মেনে সরকারিভাবে অনুমোদন পাওয়ার পর দ্রুত নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা হয় এবং সেতুটি দাঁড়িয়ে যায়।
সেতুটি তৈরি হওয়ার পর যখন মূল সড়কের সঙ্গে সংযোগের সমস্যা দেখা দেয়, তখন স্থানীয় দুই ভিন্ন পাড়ার সাধারণ গ্রামবাসীরা মানবতার খাতিরে এগিয়ে আসেন। সেতুর উভয় পাশে প্রায় ১০০ মিটার দীর্ঘ একটি মাটির সংযোগ সড়ক নির্মাণের জন্য তাঁরা নিজেদের অমূল্য ব্যক্তিগত জমিও স্বেচ্ছায় দান করেন। গ্রামবাসীদের এই চরম উদারতা এবং সহযোগিতার মানসিকতা সত্ত্বেও, সংযোগ সড়কটিকে গ্রামের মূল পিচ রাস্তার সঙ্গে যুক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় সামান্য জমির বন্দোবস্ত সংক্রান্ত আইনি বা প্রশাসনিক জটিলতা থেকেই যায়, যা সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ দীর্ঘ সময় ধরেও কোনোভাবেই সমাধান করতে পারেনি।
এদিকে সেতুর ওপর পাকা পিচ ঢালাও বা ইট গাঁথুনির কাজ তো দূরের কথা, বর্তমানে এর দুই প্রান্তে কেবল কর্দমাক্ত ও পিচ্ছিল মাটি পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। সেতুতে ওঠার কোনো পাকা রাস্তা না থাকায় আজও এর ওপর দিয়ে একটি সাইকেল বা ছোট যানবাহন চলাচল করাও সম্পূর্ণ অসম্ভব। স্থানীয় ক্ষুব্ধ গ্রামবাসীরা তীব্র ভাষায় প্রশ্ন তুলেছেন যে, মূল সড়কের সঙ্গে সংযোগের সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা না রেখে ঠিক কী উদ্দেশ্যে এমন অপরিকল্পিত ও খামখেয়ালিভাবে সেতুটি নির্মাণ করা হয়েছিল? সাধারণ মানুষের কষ্টের করের টাকার এই অপচয় এবং প্রশাসনিক অব্যবস্থার দায় একমাত্র কোন সরকারি দপ্তরের ওপর বর্তায়, তা খুঁজে বের করা এখন গোটা এলাকায় একটি সুনির্দিষ্ট তদন্তের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।