নিজের বাড়ি কেনার স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে কি বড় ভুল করছেন? ভুলেও EPF-এর টাকা ভাঙবেন না, হতে পারে সর্বস্বান্ত!

নিজের বাড়ি কেনা প্রতিটি মানুষের জীবনের অন্যতম বড় স্বপ্ন। এই স্বপ্ন পূরণ করতে মানুষ তাদের বছরের পর বছরের সঞ্চয় ও বিনিয়োগের উপর নির্ভর করেন। এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ট ফান্ড (EPF)-এ জমা হওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ দেখে চাকরিজীবী ব্যক্তিরা প্রায়শই গৃহঋণের বোঝা কমাতে বা ডাউন পেমেন্ট করার জন্য পিএফ থেকে টাকা তোলার কথা চিন্তা করেন। এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ট ফান্ড অর্গানাইজেশন (EPFO) বাড়ি কেনার জন্য আংশিক টাকা তোলার অনুমতি দিলেও, আর্থিক বিশেষজ্ঞরা কঠোরভাবে পরামর্শ দিচ্ছেন যে এমনটা করার আগে আপনার অন্তত দুবার ভাবা উচিত। কেন বাড়ি কেনার জন্য ইপিএফ-এর তহবিল ব্যবহার করা আপনার ভবিষ্যতের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে এবং এর চেয়ে কোন বিকল্পগুলো ভালো, তা জেনে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
EPFO-এর বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, কোনো কর্মচারী একটানা ৫ বছর চাকরি সম্পন্ন করলে জমি ক্রয়ের জন্য সর্বোচ্চ ২৪ মাসের মূল বেতন ও ডিএ, তৈরি বাড়ি বা ফ্ল্যাট ক্রয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৩৬ মাসের মূল বেতন ও ডিএ, এবং হাউজিং সোসাইটির মাধ্যমে বাড়ি ক্রয় করলে মোট জমার ৯০ শতাংশ পর্যন্ত তোলার সুযোগ পান। কাগজে-কলমে এই নিয়মটি বেশ সুবিধাজনক মনে হলেও, আর্থিক পরিকল্পনার দৃষ্টিকোণ থেকে এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
ইপিএফ হলো মূলত একটি সুরক্ষিত অবসরকালীন সম্পদ, কোনো সাধারণ তরল সঞ্চয়ী হিসাব নয়। জরুরি অবস্থা বা বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া এটি থেকে টাকা তুললে সরাসরি আপনার বার্ধক্যকালীন তহবিল নষ্ট হয়ে যায়। এর সবচেয়ে বড় নেতিবাচক দিক হলো চক্রবৃদ্ধি সুদের বিরাট ক্ষতি। ইপিএফ বর্তমানে ৮.২৫% হারে একটি নিরাপদ ও সম্পূর্ণ করমুক্ত (EEE ক্যাটাগরি) নিশ্চিত সুদ প্রদান করে। ধরুন, আপনার বয়স ৩০ থেকে ৩৫ বছর এবং আপনি বাড়ি কেনার জন্য পিএফ থেকে ৫ লক্ষ টাকা তুলে নিলেন। যদি এই টাকাটি পরবর্তী ২৫ বছর পিএফ-এ জমা থাকত, তবে ৮.২৫% চক্রবৃদ্ধি সুদের হারে অবসরের সময় তা বেড়ে প্রায় ৩৬ থেকে ৩৮ লক্ষ টাকায় পরিণত হতো। অর্থাৎ, আজ তোলা সামান্য ৫ লক্ষ টাকার প্রকৃত মূল্য ভবিষ্যতে প্রায় ৩৭ লক্ষ টাকারও বেশি আর্থিক ক্ষতির সমান।
এছাড়াও, পিএফ-এর টাকা তুলে নিলে অবসরকালীন তহবিলে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দেয়। ভারতীয় প্রেক্ষাপটে অধিকাংশ কর্মচারীর কাছে অবসরকালীন আয়ের প্রধান উৎস হলো এই ইপিএফ। কর্মজীবনের শুরুতে বা মাঝপথে এর একটি বড় অংশ রিয়েল এস্টেটে বিনিয়োগ করলে বৃদ্ধ বয়সে হাতে পর্যাপ্ত নগদ অর্থ থাকে না। পাশাপাশি, হোম লোনের ক্ষেত্রে আপনি দ্বৈত কর ছাড়ের সুবিধা পান, যা ইপিএফ-এর টাকা তুললে সীমিত হয়ে যায়। ধারা 24(b) অনুযায়ী সুদের উপর বার্ষিক ২ লক্ষ টাকা এবং ধারা 80C অনুযায়ী মূলধনের উপর ১.৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত কর ছাড় পাওয়া যায়। সবদিক বিচার করলে, হোম লোনের প্রকৃত খরচ ইপিএফ থেকে প্রাপ্ত সুদের চেয়ে অনেক কম হয়। তাছাড়া, ইপিএফ-এর টাকা বাড়ি বা স্থাবর সম্পত্তিতে রূপান্তর করলে তা সহজে নগদে পরিবর্তন করা যায় না।
এই সমস্ত ঝুঁকি এড়ানোর জন্য বাড়ি কেনার ক্ষেত্রে কিছু বিকল্প পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে। যেমন— ডাউন পেমেন্টের জন্য ফিক্সড ডিপোজিট (FD), রিকারিং ডিপোজিট (RD) বা লিকুইড মিউচুয়াল ফান্ডের মতো স্বল্পমেয়াদী তরল বিনিয়োগ ব্যবহার করা। প্রাথমিক পর্যায়ে ডাউন পেমেন্ট কম রেখে হোম লোনের মেয়াদ বাড়ানো এবং আয় বাড়ার সাথে সাথে তা শোধ করা। এছাড়া অব্যবহৃত বা কম আয়কারী পুরোনো সোনা কিংবা জমি বিক্রি করে তহবিল তৈরি করা যেতে পারে। হাতে যথেষ্ট টাকা না থাকলে ১-২ বছরের জন্য বাড়ি কেনা স্থগিত রেখে এসআইপি (SIP)-এর মাধ্যমে আলাদা ফান্ড তৈরি করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।