নন্দীগ্রামে ফের বড় ধাক্কা শাসকদলের! কোন জাদুবলে ঘাসফুল শিবিরকে সরিয়ে গ্রাম পঞ্চায়েত দখল করল বিজেপি?

পূর্ব মেদিনীপুর জেলার রাজনৈতিক সমীকরণে ফের এক বড়ো পটপরিবর্তন ঘটে গেল। নন্দীগ্রাম-১ ব্লকের কেন্দামারি জালপাই গ্রাম পঞ্চায়েতে এবার উড়ে গেল গেরুয়া আবির। দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর ওই গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান ও উপপ্রধানের মর্যাদাপূর্ণ চেয়ারে এবার পাকাপাকিভাবে বসে পড়লেন বিজেপি সমর্থিত দুই বিজয়ী সদস্য। উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের রাজ্য পঞ্চায়েত নির্বাচনে এই কেন্দামারি জালপাই গ্রাম পঞ্চায়েতের মোট আসনের মধ্যে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছিল ১৪টি আসন এবং নির্দল প্রার্থীরা দখল করেছিল ৮টি আসন। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে এবং কিছুদিন আগেই তৃণমূলের তৎকালীন প্রধান ও উপপ্রধান তাঁদের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এরপরই গতকাল মঙ্গলবার নতুন প্রধান নির্বাচনের দিন ধার্য করা হয়। পূর্বনির্ধারিত সেই নিয়ম অনুযায়ী নির্বাচন প্রক্রিয়া চলাকালীন সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন তৃণমূলের ১০ জন এবং নির্দলের ৭ জন সদস্য। সকলের সম্মিলিত মতামত এবং রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ মেনে শেষ পর্যন্ত প্রধান হিসেবে নির্বাচিত করা হয় আভা বেরাকে এবং উপপ্রধানের মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয় খাদিজা খাতুনের হাতে। বিশেষ সূত্রে জানা গিয়েছে যে, এই দুই জন বিজয়ী প্রার্থীই মূলত নির্দল প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে জয়লাভ করলেও পরবর্তী সময়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিজেপিতে যোগদান করেছিলেন। ফলে এই জয়ের মাধ্যমে কার্যত পদ্ম শিবিরের ঝুলিতেই গেল এই গুরুত্বপূর্ণ গ্রাম পঞ্চায়েতটি।
শুধু কেন্দামারি জালপাই গ্রাম পঞ্চায়েত একাই নয়, এর পাশাপাশি পূর্ব মেদিনীপুরের অমরর্ষি-২ গ্রাম পঞ্চায়েটেও নতুন বোর্ড গঠিত হয়েছে, যা নিয়েও রাজ্যজুড়ে রাজনৈতিক মহলে তীব্র চর্চা শুরু হয়েছে। ১৮টি আসন বিশিষ্ট এই অমরর্ষি-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের ২০২৩ সালের গত নির্বাচনে ১১ জন তৃণমূল কংগ্রেসের সদস্য এবং ৭ জন ভারতীয় জনতা পার্টির সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের জেরে প্রধান ও উপপ্রধান সহ মোট ১১ জন তৃণমূল সদস্যই একসঙ্গে পদত্যাগ করেন। এর ফলে সমগ্র পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় চরম অচলাবস্থা তৈরি হয়। এই অচলাবস্থা কাটানোর উদ্দেশ্যে স্থানীয় বিজেপি সদস্যরা ব্লক উন্নয়ন আধিকারিক বা BDO-র দ্বারস্থ হন। তাঁদের সেই আইনি আবেদনের ভিত্তিতেই পরবর্তীতে বিজেপির সদস্য ও সমর্থিতদের নিয়ে সেখানে নতুন বোর্ড গঠন করা হয়।
এদিকে, এই সমস্ত সাম্প্রতিক ঘটনার আবহেই কিছুদিন আগে নন্দীগ্রামে এসে উপনির্বাচন এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট প্রসঙ্গে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ও বিস্ফোরক মন্তব্য করেছিলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। তিনি স্পষ্টভাবে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, কালীঘাট তৃণমূল বা ঋতব্রত তৃণমূলের কেউ এই অঞ্চলে উপনির্বাচনে প্রার্থী দেওয়ার সাহস পাবে না। প্রায় দুই দশক আগে তিনিও একসময়ে নন্দীগ্রামের ঐতিহাসিক জমি আন্দোলনের একেবারে সামনের সারিতে সক্রিয়ভাবে সামিল ছিলেন। তবে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের সেই পুরোনো রক্তাক্ত সংঘাতের স্মৃতি তিনি আর ফিরিয়ে আনতে চান না। বিগত বাম জমানায় শিল্পের স্বার্থে জমি অধিগ্রহণ করতে গিয়ে বারবার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর সরকারকে চরম সামাজিক ও রাজনৈতিক বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল। ২০০৬ সালের ২০ জুলাই শিল্পায়নের লক্ষ্যে জমির বিজ্ঞপ্তিপত্র জারি হতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন কৃষকদের একটি বড় অংশ। সরকার যখন মোট ৯৯৭ একর জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা করেছিল, তখন প্রায় ৪০০ একর জমির প্রকৃত মালিকরা জমি ছাড়তে পরিষ্কার অস্বীকার করেন। কৃষকদের সেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও অসন্তোষকে প্রধান হাতিয়ার করেই রাজনৈতিক ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছিলেন তৎকালীন বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পাশাপাশি, বিগত বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশ্যে আসার পর নন্দীগ্রামে এসে তিনি সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে একগুচ্ছ উন্নয়নের নতুন আশ্বাসও দিয়েছিলেন। এখন রাজনৈতিক পালাবদলের এই প্রেক্ষাপটে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় কাঙ্ক্ষিত দিনবদলের স্বপ্ন কবে বাস্তবিক রূপ নেয়, সেই দিকেই অধীর আগ্রহে তাকিয়ে রয়েছে সমগ্র নন্দীগ্রামের আপামর জনসাধারণ।