“নদীর পাড়ে বাস যার, আতঙ্ক বারো মাস!” সুবর্ণরেখার ভয়াবহ ভাঙনে মানচিত্র থেকে মুছে যাওয়ার উপক্রম গ্রাম!

“নদীর পাড়ে বাস যার, আতঙ্ক তার বারো মাস”, বর্ষার মরসুম শুরু হলেই প্রবাদটি যেন এক নির্মম বাস্তবে রূপ নেয় নদীপাড়ের সাধারণ মানুষের জীবনে। বর্ষার সময় সুবর্ণরেখা নদীর জলস্তর অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে নদীর ভাঙন। আর এই জলোচ্ছ্বাস ও ভাঙন এখন পশ্চিম মেদিনীপুরের গোপীবল্লভপুর-১ নম্বর ব্লকের করবনিয়া গ্রামের প্রায় ৩০০টি অসহায় পরিবারের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। প্রতিমুহূর্তে তাঁদের মনে একটাই ভয়—এই বুঝি ভিটেমাটি সব ভেসে গেল নদীর গর্ভে।

গ্রামবাসীদের অভিযোগ, বর্ষার শুভারম্ভ থেকেই সুবর্ণরেখা নদীর পাড় ভাঙার প্রবণতা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ইতিমধ্যেই নদীর করাল গ্রাসে তলিয়ে গিয়েছে বিঘার পর বিঘা উর্বর কৃষিজমি। নদীর সর্বনাশা জলস্তর ক্রমশ গ্রামের দিকে এগিয়ে আসছে। এর ফলে শুধু চাষের জমিই নয়, চরম বিপদের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে গ্রামের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো, যার মধ্যে রয়েছে স্কুল, কলেজ, চিকিৎসালয় এবং প্রাচীন মন্দির। বিশেষ করে করবনিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়, সরকারি পানীয় জলের পাম্প এবং নদীপাড়ে অবস্থিত ঐতিহাসিক শিবমন্দিরটি এখন যে কোনো মুহূর্তে নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার চরম আশঙ্কার মুখে দাঁড়িয়ে আছে।

করবনিয়া গ্রামের সিংহভাগ মানুষই মূলত কৃষিকাজের উপর সরাসরি নির্ভরশীল। এছাড়া গ্রামের একটি বিশাল অংশের বাসিন্দা তফসিলি উপজাতি সম্প্রদায়ের মানুষ, যাঁদের একমাত্র জীবিকা নির্বাহের অবলম্বন হলো এই পলিমাটি সমৃদ্ধ চাষের জমি। ফলে চোখের সামনে একের পর এক কৃষিজমি নদীগর্ভে চলে যাওয়ায় শুধু আর্থিক সম্পত্তি বা ফসলের ক্ষতি হচ্ছে তা নয়, বরং গোটা গ্রামের আগামী দিনের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক গভীর অনিশ্চয়তার কালো মেঘ ঘনাতে শুরু করেছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বর্ষা এলেই এই নদীভাঙনের সমস্যা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, কিন্তু চলতি বছরের পরিস্থিতি অতীতে সমস্ত রেকর্ড ছাড়িয়ে গিয়েছে। নদীর পাড় ক্রমশ ধসে বসে যাওয়ায় বহু পরিবার নিজেদের মাথা গোঁজার ঠাঁই তথা বাড়িঘর নিয়ে চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। বিশেষ করে রাতের অন্ধকারে যখন চারদিক নিস্তব্ধ থাকে, তখন নদীর জলের গর্জনে স্থানীয়দের বুক কেঁপে ওঠে। তাঁদের প্রবল আশঙ্কা, যদি অবিলম্বে রাজ্য প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দফতর কড়া পদক্ষেপ না করে, তবে আগামী দিনে আরও বহু বসতবাড়ি ও উর্বর জমি চিরতরে নদীর পেটে চলে যাবে।

গ্রামবাসীদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে করবনিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়টি। গ্রামের কচিকাঁচারা এই স্কুলেই তাদের প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করে। কিন্তু নদীভাঙন যেভাবে স্কুল ভবনের দিকে ক্রমশ এগিয়ে আসছে, তাতে কোমলমতি শিশুদের পঠনপাঠন তো বটেই, গোটা স্কুলবাড়িটির অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে সরকারি জল পাম্প এবং শিবমন্দির রক্ষা নিয়েও তীব্র উদ্বেগ ছড়িয়েছে। স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, বহুবার প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে নদীভাঙনের এই স্থায়ী সমস্যার কথা লিখিত ও মৌখিকভাবে জানানো সত্ত্বেও কোনো স্থায়ী ও কার্যকর সমাধান মেলেনি। বর্ষার সময় কেবল সাময়িক তৎপরতা দেখা গেলেও স্থায়ী নদীবাঁধ বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না হওয়ার কারণে প্রতি বছরই একই দুর্বিষহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় তাঁদের।

পরিস্থিতি এতটাই জটিল রূপ নিয়েছে যে, করবনিয়া গ্রামের বাসিন্দারা এখন সুবর্ণরেখার পাড়ে অবিলম্বে একটি মজবুত ও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের জোরালো দাবি তুলেছেন। তাঁদের দ্ব্যর্থহীন বার্তা, আর কালবিলম্ব না করে এখনই যদি নদীপাড় সংরক্ষণের সুনির্দিষ্ট কাজ শুরু না করা হয়, তবে আগামী দিনে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ মানুষের ধারণার বাইরে চলে যাবে। কৃষিজমি হারানোর পাশাপাশি স্কুল, মন্দির, পানীয় জলের পরিকাঠামো এবং বাসস্থানগুলি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আগেই প্রশাসনের কাছে তাঁদের একটাই আকুল আবেদন—জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে গ্রাম ও গ্রামবাসীদের জীবন ও সম্পত্তির পূর্ণ নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা হোক।