কেন দেওয়া হয় সাপের গায়ে দুধ? জানুন নাগ পঞ্চমীর আসল ব্রতকথা ও পুজো করার গোপন নিয়ম!

হিন্দু সনাতন ধর্মে সাশ্রাবণ মাসের শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথি অত্যন্ত পবিত্র ও মাহাত্ম্যপূর্ণ একটি দিন হিসেবে পালিত হয়ে থাকে, যা আজ ‘নাগপঞ্চমী’ নামে সর্বজনবিদিত। এই বিশেষ পবিত্র দিনে মহাশিবের আরাধনার পাশাপাশি দেবতুল্য নাগদেবতাদের পুজো করার প্রাচীন প্রথা চলে আসছে। সনাতন সংস্কৃতিতে নাগদের সাধারণ প্রাণী হিসেবে দেখা হয় না, বরং তাদের ঈশ্বরের সমতুল্য মর্যাদা দেওয়া হয়। দেবাদিদেব মহাদেবের গলায় সাপই অলংকার হিসেবে শোভা পায় এবং ভগবান বিষ্ণুও অনন্ত নাগের শয্যাতেই পরম শান্তিতে শায়িত থাকেন। এই কারণেই দেবাদিদেবের অত্যন্ত প্রিয় শ্রাবণ মাসের এই বিশেষ তিথিতে সর্পকুলের পুজো করার বিশেষ বিধান রয়েছে। গ্রামীণ ভারতের বহু ঐতিহ্যবাহী অঞ্চলে আজও এই দিনে ঘরের দেওয়ালে গোবর ও গেরুমাটি দিয়ে নান্দনিক নকশায় সাপের ছবি এঁকে বিশেষ আরাধনা করা হয়। এমনকি একটি পবিত্র সুতোয় সাতটি সুনির্দিষ্ট গাঁট বেঁধে তাকে প্রতীকী সাপ হিসেবে কাঠের পিঁড়িতে রেখে পুজো করার প্রথাও অত্যন্ত প্রাচীন।

নাগ পঞ্চমীর এই পবিত্র তিথিতে পুজোর নির্দিষ্ট নিয়ম ও বিধান মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। নিয়ম অনুযায়ী, পুজোর থালায় হলুদ, রোলে বা সিঁদুর, চাল এবং তাজা ফুল সাজিয়ে প্রথমে নাগ দেবতার অর্চনা করতে হয়। এরপর কাঁচা দুধ, ঘি এবং সামান্য চিনি একসঙ্গে মিশিয়ে সেই প্রতীকী সুতোরূপী সর্পদেবতাকে অর্পণ করতে হয়। পুজোর এই শুভ মুহূর্তে ভক্তিভরে ‘अनन्तम्, वासुकि, शेषम्, पद्मनाभम्, चकम्बलम् कर्कोतकम् तक्षकम्’ এই বিশেষ পৌরাণিক মন্ত্র উচ্চারণ করে নাগ দেবতার স্তুতি করা বাঞ্ছনীয়। মন্ত্র পাঠ শেষে ধূপ-ধুনো জ্বালিয়ে সর্প দেবতার নিয়মনিষ্ঠা সহকারে আরতি করার পরই এই পুজোর পূর্ণ ফল লাভ করা সম্ভব হয়।

এই উৎসবকে ঘিরে একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও রোমাঞ্চকর পৌরাণিক ব্রতকথা প্রচলিত রয়েছে। প্রাচীনকালে এক বিত্তশালী মহাজনের সাতটি পুত্র এবং তাঁদের সাতজন স্ত্রী ছিল। বড় ছয়জনবধূর বাপের বাড়ি থাকলেও, সেই পরিবারের ছোট বউটি ছিল দুর্ভাগ্যবশত অনাথ ও ভাইহীন। বর্ষার প্রথম মাস শ্রাবণ আসতেই ছয় বউ বাপের বাড়ি চলে গেলেও ছোট বউটি নিঃসঙ্গ মনে ঘরে বসে দীর্ঘশ্বাস ফেলত এবং মনে মনে নাগদেবতার কাছে প্রার্থনা করত যে, হে দেবতা! তুমিই আমার বাপের বাড়ি হয়ে আমায় রক্ষা করো। ভক্তের এই আর্তনাদ শুনে দয়ালু নাগদেবতা এক ব্রাহ্মণ যুবকের ছদ্মবেশ ধারণ করে ছোট বউটির সামনে আবির্ভূত হন এবং তাকে সসম্মানে নিজের সঙ্গে বাপের বাড়ি নিয়ে রওয়ানা দেন। কিছুটা পথ অতিক্রম করার পরই তিনি নিজের আসল দিব্য রূপ ধারণ করেন। ছোট বউটি কিছুটা ভয় পেলেও নাগদেবতা তাকে সোজা পাতালে অবস্থিত নিজালয়ে নিয়ে যান এবং নিজের স্ত্রীকে ডেকে বলেন যে ইনি আমার বোনের মতো, এঁর যেন কোনো প্রকার কষ্ট না হয়।

কিছুদিন পর নাগপত্নী একটি সন্তানের জন্ম দেন। একদিন রাতে প্রসূতি নাগিনকে দেখতে ছোট বউটি যখন প্রদীপ হাতে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে, তখন হঠাৎ ভয়ে তার হাত থেকে প্রদীপের আলো কাঁপে এবং প্রদীপটি পড়ে গিয়ে নবজাতক নাগশিশুদের লেজ কিছুটা পুড়ে যায়। এই মর্মান্তিক ঘটনায় ক্রুদ্ধ হয়ে নাগিন তার স্বামীর কাছে নালিশ জানায় যে এই মানবকন্যাকে যেন দ্রুত তার শ্বশুরবাড়িতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর নাগদেবতা প্রচুর ধনরত্ন ও উপহার দিয়ে তাঁর বোনকে সসম্মানে বিদায় জানান। ঠিক পরের বছর শ্রাবণ মাস আসতেই ছোট বউটি দেওয়ালের গায়ে নাগ দেবতার প্রতিমা এঁকে পরম ভক্তি ও নিষ্ঠার সঙ্গে পুজো শুরু করে। এদিকে মায়ের মুখে লেজ পুড়ে যাওয়ার সমস্ত ঘটনা শুনে নাগশিশুরা যখন বদলা নিতে আসে, তখন ছোট বউটিকে নিজের আরাধনায় সম্পূর্ণ মগ্ন ও পবিত্র দেখতে পেয়ে তাদের সমস্ত রাগ মুহূর্তেই গলে জল হয়ে যায়। সন্তুষ্ট হয়ে তারা প্রসাদ হিসেবে দুধ ও চাল গ্রহণ করে এবং তাকে আশীর্বাদ করে যে, আজ থেকে এই পরিবারে সাপের কোনো ভয় থাকবে না। সেই সঙ্গে তারা বর দেয় যে, শ্রাবণ শুক্লপক্ষের পঞ্চমীতে যে ভক্তই ভাইরূপে তাদের পুজো করবে, নাগকুল চিরকাল তার বংশের রক্ষা করবে।

Riya Chakrabarty
  • Riya Chakrabarty