অ্যাসিডে পুড়ে যাওয়া শরীরের অংশ সহজে আর আগের অবস্থায় ফিরে আসে না। কেন জানেন? কারণ অ্যাসিড সেখানকার কোষগুলোকেই চিরকালের মতো মেরে ফেলে। নতুন টিস্যু তৈরি হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়। গত কয়েক দশকে বাংলার ক্ষমতার সর্বোচ্চ স্তর থেকে এই কথাগুলো বারবার উচ্চারিত হয়েছে। আজ যখন পেছনের দিকে ফিরে তাকাই, তখন মনে হয় ওই কথাগুলো শুধু রাজনৈতিক ভাষণ ছিল না, ওগুলো ছিল সাধারণ মানুষের মনে এঁকে দেওয়া এক একটা গভীর ক্ষত। কামদুনি, পার্ক স্ট্রিট, হাঁসখালি, আর জি কর, দুর্গাপুর— তালিকাটা দীর্ঘ। এই প্রতিটি নাম আজ অ্যাসিডের সেই পোড়া দাগের মতো বাঙালির বিবেককে দংশন করছে।
দুর্নীতি বা চুরি ছিলই, কিন্তু বাংলার মেয়েদের যখন অপমানের চরম সীমায় পৌঁছাতে হয়, তখন সব হিসেব ওলটপালট হয়ে যায়। লোয়ার কোর্টে ফাঁসি বা যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত অপরাধীদের বাঁচাতে যখন ৩৪ বার সরকারি কৌঁসুলি বদল করা হয়, যখন ধর্ষিতা মেয়ের ইজ্জতের দাম ১০ লাখ টাকা ধার্য করা হয়, তখন বিচারব্যবস্থার ওপর থেকে মানুষের বিশ্বাস টলে যায়। মর্মান্তিক ক্ষতবিক্ষত দেহ দেখার পর যখন হাসপাতাল থেকে ‘আত্মহত্যা’র তকমা সেঁটে দেওয়া হয়, কিংবা শেষ বিদায়ের আগে বাবা-মাকে যখন মেয়ের মুখটুকু দেখতে দেওয়া হয় না— সেই যন্ত্রণার ভাষা কোনো কলমে ধরা সম্ভব নয়।
একদিকে ‘বাঙালি অস্মিতা’ ও মাতৃ-উপাসনার গালভরা বুলি, আর অন্যদিকে শিক্ষাঙ্গনে সরস্বতী পুজো করতে গিয়ে ছাত্রীদের পেতে হয় ধর্ষণের হুমকি। কী অদ্ভুত বৈপরীত্য! আমরা দেখেছি জেলের প্রিজন ভ্যানে বসে এক প্রাক্তন বিধায়কের দাপট, আবার সেই দাপট ঢাকতে পুলিশের ভ্যানের গায়ে ‘তাক ধিনা ধিন’ বোলে তাল ঠোকা। পরিবর্তনের নামে আমরা কী পেলাম? সন্দেশখালি মডেল না কি ডায়মন্ড হারবার মডেল? পুলিশের সামনে বুক ফুলিয়ে অপরাধীদের ভিক্টরি সাইন দেখানোর স্পর্ধা আজ বাংলার গা সওয়া হয়ে গেছে। বগটুইয়ের সেই অগ্নিগর্ভ রাতে যখন একটা গোটা পরিবার শেষ হয়ে গেল, পুলিশ তখন শর্ট সার্কিটের বাহানায় মুখ লুকোচ্ছিল।
পুলিশের এই অসহায়তা বা আনুগত্য— যাই বলুন না কেন, তা আজ স্পষ্ট। সাধারণ মানুষের হেলমেটহীন বাইক চালানো বা স্টপ লাইন পার হওয়া নিয়ে আইনের কড়াকড়ি থাকলেও, বিশেষ বিশেষ অঞ্চলের ‘দাদা’দের জন্য আইন এখানে অন্ধ। শিক্ষিত বেকারদের রাস্তায় রোদ-জল মাথায় নিয়ে হকের চাকরির জন্য লড়াই করতে দেখেছি, দেখেছি গর্ভবতী চাকরিপ্রার্থীর ওপর পুলিশের নির্মম লাঠিচার্জ। একদিকে হকের লড়াই, আর অন্যদিকে মন্ত্রীর বান্ধবীর খাটের তলায় টাকার পাহাড়— এই বৈষম্যই বাংলার বর্তমান রূপ।
আসলে এই সব ঘটনা অ্যাসিডে পোড়া দাগের মতো আমাদের মনে গেঁথে গেছে। মাঝরাতে দুঃস্বপ্ন দেখি— কেউ আমাদের বোন বা মেয়ের গলা টিপে ধরেছে, তাদের হাড় ভেঙে দিচ্ছে। সেই যন্ত্রণায় ঘুম ভেঙে যায়। মনে হয় এই ক্ষতের কোনো চিকিৎসা নেই, কোনো মলম নেই। তবে ভোটের পর সেই প্রবল বৃষ্টি যেন এক অদ্ভুত সংকেত নিয়ে এল। যে বৃষ্টির জলে হয়তো দীর্ঘদিনের জমে থাকা পাপ ধুয়ে যাওয়ার প্রার্থনা ছিল। সেই বৃষ্টি হয়তো বয়ে এনেছিল সেই সব মেয়েদের চোখের জল, যাদের দেহ অকালেই ছাই হয়ে গঙ্গার জলে মিশেছে। তবে আসল আরাম সেদিনই মিলবে, যেদিন এই অ্যাসিডে পোড়া ক্ষতে ন্যায়ের প্রলেপ পড়বে। যেদিন অন্তত একজন ধর্ষিতা বা বঞ্চিত মানুষ প্রকৃত বিচার পাবে।





